WWW.ANB24.COM

ন্যায়ের কথা বলি

হত্যাকান্ড ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে?

ডেস্ক রিপোর্ট,

রাহেলা হত্যার ৪০ দিন পরেও পুলিশ কোনো কুল-কিনারা করতে পারেনি। হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত এমন কাউকে এখন পর্যন্ত গ্রেফতার করা সম্ভব হয় নি। প্রশ্ন উঠেছে, তবে কি রাহেলা হত্যাকান্ড ধামাচাপা পড়ে যাচ্ছে?
রাহেলার স্বজনদের সাথে কথা বলে জানা গেছে, তারা এই হত্যাকান্ডের ব্যাপারে কোনো আইনি ঝামেলায় (!) জড়াতে চায় না। ছেলে-মেয়ে ও অন্য স্বজনরা এখন রাহেলার জেদি-স্বভাব ও উচ্ছৃংখল জীবনের সমালোচনা করছেন। স্বজনরা এখন রাহেলার রেখে যাওয়া সম্পত্তির ব্যাপারেই বেশি আগ্রহ দেখাচ্ছেন।
৬৫ বছর বয়সী রাহেলা বেগমের লাশ এ বছরের ২৭ মে তার নিজ বাসগৃহ থেকে পুলিশ উদ্ধার করে। প্রত্যক্ষদর্শিদের বর্ণনা মতে, রাহেলার লাশ পুরোটাই বস্ত্রহীন ছিল। মুখ থেতলানো, জিহবা ফাটা ছিল। লাশ থেকে দুর্গন্ধ বের হচ্ছিল। লাশের হাত ও মুখ পোড়া ছিল মনে হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, রাহেলাকে দু’দিন আগেই হত্যা করা হয়। লাশ শনাক্তকালে ঘরের ফ্যান ঘুরছিল ও লাইট জ্বলছিল। রাহেলার সার্বক্ষণিক ব্যবহৃত স্বর্ণের চেন ও কানে স্বর্ণের দুল (আটআনি) লাশের সাথে পাওয়া যায় নি।
মৃতার স্বজনদের সূত্রে জানা গেছে, রাহেলা তার বাড়ির আঙিনায় লাগানো গাছের কলা প্রতিবেশি এক নারীর কাছে বিক্রি করেছিলেন ২৫ মে মঙ্গলবার। ওই নারী ২৭ মে বৃহস্পতিবার কলার দাম দিতে এসে ঘরের মধ্যে রাহেলার লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। তিনি এ কথা জনৈক রতনের স্ত্রীকে জানালে সে রাহেলার মেয়েকে গিয়ে খবর দেয়। মেয়ে তাৎক্ষণিক ছুটে এসে ঘরে লাশ পড়ে থাকতে দেখেন। খবর দেয়া হলে শাহমখদুম থানা পুলিশ লাশ জব্দ করে মর্গে পাঠায়। ময়না তদন্ত শেষে পরদিন শুক্রবার বিকেল ৫ টায় কালুরমোড়ের গোরস্থানে লাশ দাফন করা হয়।
উল্লেখ্য, নগরীতে সংঘটিত এই হত্যাকান্ড সম্পর্কে কোনো প্রতিবেদন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ কিংবা প্রচার হয়নি।
শাহ মখদুম থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাইফুল ইসলাম জানান, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পায়নি। শরীরে কোন ইঞ্জুরি (আঘাত) ছিলো না। তাই থানায় অপমৃত্যুর মামলা হয়েছে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে মার্ডার (হত্যাকান্ড) আসে, তাহলে সেটি হত্যা মামলা হবে। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদনে যে রিপোর্ট আসবে, সেইভাবে পরিবর্তী পদক্ষেপ নেয়া হবে।’
রাহেলার লাশ শনাক্তের পর কিছু মানুষের গতিবিধিতে সন্দেহ ডানা মেলছে। নিহত রাহেলার ছিলো জমি, বাড়ি ও গহনা। এই সম্পদগুলো কি কাল হলো রাহেলার? যদি তাই হয়- তাহলে বিবস্ত্র অবস্থায় পড়ে থাকা রাহেলার মরদেহ কী ইঙ্গিত করছে? চুরির জন্য হত্যাকা- হলে গরু-ছাগল কেনো চুরি হয়নি? নাকি শুধু গহনার জন্যই হত্যাকান্ড। না রাহেলাই কোনো অপরাধ জগতের সাথে জড়িয়ে পড়েছিল? এমন কিছু প্রশ্ন স্থানীয়দের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সন্দেহের তির রাহেলার স্বজনদের দিকেও। নিহত রাহেলার সম্পদ নিয়ে ছেলে জুয়েল ও মেয়ে রত্নার মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে মনোমালিন্য চলে আসছিল। স্বজনদের ভাষ্যেই এ তথ্য উঠে এসেছে। অন্যদিকে হত্যাকান্ডের পরে রাহেলার বাড়ি-সংলগ্ন বাগানে নিয়মিত জুয়ার আসর বন্ধ হয়ে গেছে। জুয়াড়িদের সাথে রাহেলার সু-সম্পর্ক ছিলো বলে জানা গেছে।
নাম প্রকাশ না করা শর্তে স্থানীয় এক গৃহবধু জানান- ‘জুয়াড়িরা রাহেলার বাড়ির পাশে নিয়মিত আসর বসাতো। বিভিন্ন সময় রাহেলার বাড়িতে খাওয়া-দাওয়া হতো। বৃষ্টি হলে জুয়ার আসর বসতো রাহেলার বাড়িতে। গৃহবধুর জানা মতে, জুয়াড়িরা তাকে প্রতিদিন ১শো টাকা দিতো। তিনি এ তথ্য অন্যের মুখ থেকে শুনেছেন। তবে রাহেলার বাড়িতে জুয়াড়ির একটি বাইসাইকেল পাওয়া গেছে।
তিনি আরও জানান- ‘রাহেলা উন্নয়ন সংস্থা আশা থেকে ২২ হাজার টাকা ঋণ নিয়ে ছিলো। রাহেলাকে প্রতি সপ্তায় ৮শো টাকা কিস্তি শোধ করতে হতো।
স্বজনদের দেয়া তথ্যমতে, বৃদ্ধা এই নারীকে ছেলে-মেয়েরা কোনোরূপ সাহায্য-সহযোগিতা করতো না। রাহেলার দুটি গরু ও তিনটি ছাগল ছিলো। একটি গরু রাহেলার মৃত্যুর কয়েকদিন আগে মারা যায়। অপরটি দুধেল গরু হলেও পাঁচ মাস আগে থেকে দুধ দিতো না। ফলে তার আয় একবারে বন্ধ হয়ে যায়। মেয়ে রত্নার ভাষ্যমতে, রাহেলার মৃত্যুর পর গরু ও ছাগল বিক্রি করে মায়ের ঋণ পরিশোধ করেছেন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, রাহেলা ১৯৮০ সালে রাজশাহী টেক্সটাইল মিলে শ্রমিক পদে চাকরিতে ঢোকেন। স্বামী তাজবুল সেখানে আগে থেকেই চাকরি করতেন। রাহেলা নিজেকে ‘অক্ষম’ ঘোষণা করে ১৯৯৭ সালের দিকে চাকরি থেকে অবসর নেন। তিনি এককালীন ৭০ হাজার টাকা পেয়েছিলেন। এই টাকা থেকে তিনি পূর্ব প্রতিশ্রুত মেয়ের বিয়েতে যৌতুক হিসেবে জামাইকে ২৪ হাজার টাকা পরিশোধ করেন। ১৯৯৫ সালে মেয়ে রত্নাকে বিয়ে দিলে যৌতুকের টাকা বকেয়া ছিল। বাকি টাকায় টেক্সটাইলের পূর্বে রায়পাড়ার দেড় কাঠা জমি কিনে দোতালা বাড়ি করেন। এক পর্যায়ে এই বাড়ি বিক্রি করেন ৮ লাখ টাকায়। এরপর তিনি ফুলতলাতে ২০১০ সালের দিকে ৪ কাঠা জমি কেনেন। সেখানেও পাকা বাড়ি করেছিলেন। কিন্তু এই বাড়িও তিনি ১১ লাখ টাকায় বিক্রি করেন। ৬ লাখ টাকা ব্যাংকে জমা রাখেন এবং মুরশইলে মায়ের দেয়া ১ কাঠা জমির ওপর ৫ লাখ টাকা ব্যয়ে পাকা বাড়ি করেন। পরে ব্যাংকের টাকা থেকে ট্রাক-টার্মিনালের পশ্চিমে ২০১৫ সালের দিকে (রেজি. সহ) আড়াই লাখ টাকায় ২ কাঠা জমি কিনেন। এবং ২০১৮ সালের দিকে জমির ওপর চার রুমের পাকা বাড়ি তৈরি করেন। এই বাড়িতেই রাহেলা বসবাস করতেন এবং এই বাড়ি থেকেই তার লাশ উদ্ধার করা হয়।
জানা যায়, রাহেলার স্বামী (বর্তমানে রিক্সাচালক) তাজবুল হক লাল্টুর সাথে ৩১ জুলাই ১৯৭৮- এ বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হন। কাবিননামা অনুযায়ী ওইসময় রাহেলার বয়স ছিল ১৮ বছর। সে অনুযায়ী তার বয়স ৬১ বছর। আর জাতীয় পরিচয়পত্রে তার জন্ম ১ ফেব্রুয়ারি ১৯৫৬। সে মোতাবেক রাহেলার বয়স হয়েছিল ৬৫ বছর। কিন্তু পারিবারিক দ্বন্দ্বে ১৯৯৩ সালে রাহেলা স্বামীর সাথে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। ছেলে জুয়েল ও মেয়ে রত্না মায়ের সাথেই চলে যায়। তবে স্বামী তাজবুল হক দাবি করেছেন- তার স্ত্রী তাকে ছেড়ে পৃথক থাকলেও কেউ কাউকে তালাক দেয়নি।
রাহেলা ২০১৭ সালের দিকে বরিশালের কাঠমিস্ত্রি সালেককে বিয়ে করেন। কিন্তু মাস দুয়েক পরেই রাহেলকে তালাক দিয়ে সালেক বরিশালে চলে যায়।
এবিষয়ে ১৭ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর শাহাদত আলী শাহ জানান, ‘লোকে রাহেলাকে মেরে ফেলেছে শুনেছি। এখন থানা পুলিশ বিষয়টি দেখছে।’ বাড়ির চাবি ও দলিলের বিষয়ে তিনি বলেন- ‘রাহেলার মেয়ে রত্না আমার কাছে বাড়ির চাবি জমা দিয়েছে। তবে দলিলের বিষয়ে আমি জানি না।’
(বুধবার দ্বিতীয় প্রতিবেদন প্রকাশ হবে)

%d bloggers like this: