নিকাহ্ রেজিস্ট্রার: আপিলে আইনি যেসব যুক্তি তুলে ধরার প্রস্তুতি

‘নারীরা নিকাহ্ রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না’ বলে হাইকোর্টের রায় এমন সময়ে এসেছে যখন নারীর ক্ষমতায়নে বাংলাদেশ বিশ্বে রোল মডেল। দেশের গুরুত্বপূর্ণ পদ থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে নারীরা অধিষ্ঠিত। পাইলট থেকে শুরু করে মেজর জেনারেল হয়েছেন নারীরা। জাতীয় প্রেসক্লাবও প্রথমবারের মতো নারী সভাপতি পেয়েছে। চারদিকে যখন নারীর জয়জয়কার তখন হাইকোর্টের এ রায়।

Nagad Banner

নারীর ‘শারীরিক ডিসকোয়ালিফিকেশন’-এর কথা উল্লেখ করে কেন এমন রায় দিলেন হাইকোর্ট? এমন রায় বিশেষ করে ‘নারীর শারীরিক ডিসকোয়ালিফিকেশন’ এর কথা উল্লেখ থাকায় বেশ আলোচনা হচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

ফাউন্ডেশন ফর ল’ এন্ড ডেভলপমেন্ট এর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম বলছেন, দেশের প্রচলিত আইন এবং মুসলিম ল’ অনুযায়ী নারীরা ম্যারেজ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন। এক্ষেত্রে তাদের কোনো আইনি বাধা নেই। রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করা হচ্ছে।

ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান (জামান) অবশ্য বলেছেন, হাইকোর্ট এ সংক্রান্ত যাবতীয় আইন ব্যাখ্যা করে এ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন যে, নারীর সৃষ্টিগত কারণে শারীরিক কিছু প্রতিবন্ধকতা থাকায় ম্যারেজ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন না। এর ফলে আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্ত বহাল রয়েছে। আর আপিল বিভাগ এতে এখনও যেহেতু ‘ইন্টারফেয়ার’ করেননি সুতরাং এটাই এখন আইন।

শুরু যেভাবে
ঘটনার শুরু ২০১৪ সালে। নিকাহ্ রেজিষ্ট্রার হতে দিনাজপুরের একাধিক নারী আবেদন করেছিলেন। আইন মন্ত্রণালয়ে তাদের নিয়োগের বিষয়ে সুপারিশও এসেছিল। কিন্তু, ওই বছরের ১৬ জুন আইন মন্ত্রণালয় ‘বাংলাদেশের বাস্তব অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে নারীদের দ্বারা নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের দায়িত্ব পালন করা সম্ভব নয়’ মত দিয়ে নিয়োগের জন্য সুপারিশ করা ওই প্যানেল বাতিল করে।

প্যানেলের একজন আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন। তার নাম আয়েশা সিদ্দিকা। রিটটি আমলে নিয়ে আইন মন্ত্রণালয়ের চিঠি কেন বাতিল করা হবে না, জানতে চেয়ে রুল জারি করেন হাইকোর্ট।

কিন্তু, শেষ পর্যন্ত শুনানি শেষে রুলটি খারিজ করে রায় দিয়েছেন বিচারপতি জুবায়ের রহমান চৌধুরী ও বিচারপতি কাজী জিনাত হকের হাইকোর্ট বেঞ্চ।

আপিলের সিদ্ধান্ত
অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম বলেছেন: হাইকোর্ট আইন মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তকে বহাল রেখে রায় দিয়েছেন। সেটা তারা দিতেই পারেন। সেই স্বাধীনতা এবং এখতিয়ার আদালতের অবশ্যই রয়েছে।

‘‘কিন্তু এ রায়ে কিছু ‘ত্রুটি’ রয়েছে। এজন্য আমরা সন্তুষ্ট নই। উচ্চ আদালতে আমরা আপিল করবো,’’ বলে জানিয়েছেন তিনি।

ফাওজিয়া করিম বলেছেন: এ রায় কতোটুকু যুক্তিযুক্ত সেই বিষয়েও বিশদ আলোচনা হবে। আমরা সুনির্দিষ্ট কিছু পয়েন্টে কথা বলবো। সেই পয়েন্ট অনুযায়ী রায়টি উচ্চ আদালতে পুনর্বিবেচনায় আসতে পারে।

রায়ে কী বলা হয়েছে
রায়ের পর্যবেক্ষণে তুলে ধরে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান বলেছেন: ‘মাসিকের কারণে একজন নারী প্রাকৃতিকভাবে প্রত্যেক মাসে একটি নির্দিষ্ট সময়ে ধর্মীয় আচারাদি পালন করতে পারেন না। একজন মুসলিম নারী ওই সময়ে নামাজ আদায় করতে পারেন না কিংবা মসজিদে যেতে পারেন না। ফলে ওই সময় কোন বিয়ের অনুষ্ঠান হলে তিনি কিভাবে সামলাবেন? এমন প্রশ্ন রাখা হয়েছে রায়ের পর্যবেক্ষণে।’

এছাড়া নারী হওয়ার কারণে একজন মুসলিম ম্যারেজ রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনে কিছু সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কথাও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।

‘মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯’ এর ২২ ধারা অনুযায়ী বিয়ের অনুষ্ঠান এবং রেজিস্ট্রি কি একই বিষয়? নাকি আলাদা? এমন প্রশ্ন ছিল ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামানের কাছে। তিনি বলেন: এ ধারা অনুযায়ী বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা এবং রেজিস্ট্রি আলাদা বিষয়।

এ বিষয়ে ফাওয়জিয়া করিম বলেন: বিয়ের অনুষ্ঠান এবং রেজিস্ট্রি সম্পূর্ণ আলাদা। আমাদের সমাজে বিয়ের অনুষ্ঠান সাধারণত মসজিদের ইমাম সাহেব বা অন্য কোনো যোগ্যতাসম্পন্ন আলেম সম্পন্ন করেন। কিন্তু রেজিস্ট্রি আমাদের দেশের আইনে রয়েছে, মুসলিম আইনে রেজিস্ট্রি বলতে কিছু নেই। এটা সাধারণত দাপ্তরিক কাজ। এটা যে কেউ করতে পারেন। এখানে নারী-পুরুষের বিভেদ আসতে পারে না।

তিনি জানান: ম্যারেজ রেজিস্ট্রি ফরমের শেষ দিকে ‘নিকাহ রেজিস্ট্রারের স্বাক্ষর ও সীল’ এবং ‘যে ব্যক্তির দ্বারা বিবাহ পড়ানো হইয়াছে তাহার স্বাক্ষর’ নামে দুটো আলাদা অপশন রয়েছে। এর অর্থ হচ্ছে, নিকাহ রেজিস্ট্রারকে বিয়ে পড়ানো বা এ সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার জন্য মসজিদে যেতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। সুতরাং নারীরাও নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন। এতে কোনো বাধা থাকার কথা নয়।

শেখ সাইফুজ্জামান (জামান) আইন মন্ত্রণালয় এবং আদালতের রায়ের পক্ষে বলেন: একটি এলাকায় একজনই বিবাহ রেজিস্ট্রার থাকবেন এবং এর কোনো ভারপ্রাপ্ত হওয়ার সুযোগ নেই। ওই এলাকায় যদি বিয়ে পড়ানোর মতো আর কেউ না থাকেন এবং রেজিস্ট্রার যদি নারী হয়, আর তার শারীরিক বিষয়ের কারণে বিয়ের অনুষ্ঠানে যেতে না পারেন তখন কী হবে? তাহলে তো বিয়ে বন্ধ থাকবে। এসব বিষয় বিবেচনা করে হাইকোর্ট রায় দিয়েছেন।

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী হাসনাত কাইয়ুম বলছেন: ‘‘বিয়ে এবং রেজিস্ট্রেশন ভিন্ন। মুসলমানদের বিয়ে হয় মুসলিম আইনে আর মুসলিম আইন অনুযায়ী বিয়ে একটি চুক্তি। রেজিস্ট্রেশন হয় রাষ্ট্রীয় আইনে। এই আইনের বয়স অল্প।

তিনি বলেন: বিয়ের রেজিস্ট্রেশন না হলে ধর্মমতে সে বিয়ে অবৈধ হবে না। বিবাহ এবং তালাক রেজিস্ট্রেশন আইন হওয়ার আগে আমাদের বাপ-দাদারা বিয়ের রেজিস্ট্রেশন করেননি, করার বিধি-বিধানও ছিল না, তাতে আমরা তাদের অবৈধ উত্তরাধিকারী নই।

হাসনাত কাইয়ুমের মতে, রেজিস্ট্রেশনের দায়িত্ব পালন করার জন্য মসজিদে যাওয়া আবশ্যক নয়, এমনকি বিয়ে করার জন্যও নয়। রেজিস্ট্রেশনের কাজ একটি রাষ্ট্রীয় আইনি দায়িত্ব। এ দায়িত্ব মুসলিম মহিলা কেন, যে কোন ধর্মের যোগ্য নারী -পুরষেরই করতে পারার অধিকার থাকার কথা।

তার কাছে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ এ প্রার্থীদের যোগ্যতা হিসেবে ‘সরকার কর্তৃক স্বীকৃত কোন বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদ্র্রাসা বোর্ড কর্তৃক নিবন্ধিত কোন মাদ্রাসা হইতে আলীম সার্টিফিকেটধারী’ হওয়ার যে কথা সে বিষয়টি উল্লেখ করে জানতে চাওয়া হয়, যে কোন ধর্মের নারী-পুরুষ কি মাদ্রাসা থেকে আলীম সার্টিফিকেটধারী হন?

উত্তরে তিনি বলেন: এখানে দুুটি পার্ট। একটা হচ্ছে- এ বিধিমালাকে যদি আপনি একমাত্র আইন ধরেন তাহলে আমার কথা ঠিক না। কিন্তু আপনি যদি কনস্টিটিউশনকে ধরেন এবং এটার ন্যাচার অব জব যদি ধরেন যে, মুসলিম  ম্যারেজের রেজিস্ট্রেশনটা আসলে কী ধরনের কাজ? এটা হচ্ছে একটা রেকর্ড কিপিংয়ের কাজ।

ব্যাখ্যায় তিনি বলেন: ‘এখন ধরেন একজন হুজুর মারা গেলে তার ডেথ সার্টিফিকেট কে দেবে? এটা দেবে ইউনিয়ন পরিষদ। ইউনিয়ন পরিষদে যে রেজিস্ট্রেশন করে সেই লোকটা তো নম-শুদ্রও হতে পারে। ওখানে বলা হয়নি যে ইউনিয়ন পরিষদে কোন নম-শুদ্রকে ডেথ রেজিস্ট্রার বা বার্থ  রেজিস্ট্রার হিসেবে রাখতে পারবেন না। সেখানে যদি আপনি আইন করতে পারেন ডেথ বা বার্থ রেজিস্ট্রেশন করবে ইউনিয়ন পরিষদ এবং ইউনিয়ন পরিষদের সচিব; এবং সেই সচিবের পদে তো আপনি এমন কথা বলেননি যে মুসলমানদের জন্য মুসলিম ডেথ রেজিস্ট্রার, হিন্দুদের জন্য হিন্দু, বৌদ্ধদের জন্য বৌদ্ধ, তা তো বলেননি। এখানেও জাস্ট একটা রেজিস্ট্রেশন, এটা হচ্ছে রেকর্ড কিপিংয়ের কাজ।’

কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে বলেছেন: ‘নিকাহ রেজিস্ট্রারের রোল অন্যান্য পাবলিক অফিসের চেয়ে আলাদা।’ এ বিষয়ে  দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে আইনজীবী হাসনাত কাইয়ুম বলেন: নিকাহ রেজিস্ট্রারের কাজ বিয়ে পড়ানো না। বিয়েটা সোলেমানাইজড হওয়ার পরে…, আমাদের এখানে একজন ধরেন তিনটা কাজ করে সেটা অন্য কথা। কিন্তু আপনি যখন নিকাহ রেজিস্ট্রার অ্যাপয়েন্টমেন্ট দিতে যান তখন অ্যাবসলিউটলি সে বিয়ে পড়াবে বিষয়টা এরকম না।

‘‘আমি যদি আজ একজনকে বিয়ে করি এবং একমাস পর যদি রেজিস্ট্রারের অফিসে গিয়ে বলি এই এই তিনজনের সামনে আমি অমুককে বিয়ে করেছি, আমাদের এ বিয়েটা আপনি রেজিস্ট্রেশন করেন। তাহলে ওনার কাজ কী? ওনার কাজ হচ্ছে আমাকে জিজ্ঞেস করা, আমার কাউন্টার পার্টকে জিজ্ঞেস করা, বড়জোর সাক্ষীদের জিজ্ঞেস করে রেজিস্ট্রেশন করা। এখন কোর্ট যেটা বলছে, কোর্ট এই দায়িত্বটা গুলিয়ে ফেলছে। আর মুসলিম আইনে বিয়ের জন্য তো কোনকিছু লাগে না। মুসলিম আইনে বিয়ে হচ্ছে একটা চুক্তি,” এভাবেই ব্যাখ্যা করেন হাসনাত কাইয়ুম।

তিনি বলেন: এটা হলো- আমি ইচ্ছেটা প্রকাশ করবো, যার সাথে ইচ্ছাটা প্রকাশ করবো সে যদি একসেপ্ট করে, এটা যদি লিগ্যাল হয় এবং এটার যদি সাক্ষী থাকে তাহলে কন্ট্রাক্ট হয়ে গেল। সুতরাং অরিজিনাল মুসলিম আইনে বিয়ে পড়ানোর জন্য কাজী লাগবে বা মোল্লা লাগবে এমন কিছুই না। মেয়ের বাবা এবং ছেলের বাবা আর দুটো লোক নিয়েও বিয়ে দিতে পারে। এখন আপনি ১৮ বছরের আইন করেছেন, রেজিস্ট্রেশন আইন করেছেন, এগুলো তো মুসলিম আইন থেকে ডিফারেন্ট। মুসলিম আইনে একজন মুসলমান ছেলে বা মেয়ে অথবা কিতাবি (যে চারজন নবীর ওপর কিতাব নাজিল হয়েছে, তাদের অনুসারী) যে কাউকে বিয়ে করতে পারেন।

এ আইনজীবী বলেন: একজনের একটা বিয়ে, বিয়েটা আসলে হয়েছে কি হয়নি, তারা বিয়েটা করছে কি করছে না, এটা একটা রেজিস্ট্রেশন করা লাগে। ৭৪ সালে এই আইনটা হয়েছে কারণ অনেকেই বিয়ে করে অস্বীকার করে, তাতে আসলে নারীরা প্রতারিত হন। নারীদের জন্যই তো আইনটা করা হয়েছে। নারীদের জন্য একটা আইন করে তাদেরকেই…।

হাসনাত কাইয়ুম বলেন: বিদ্যমান আইনটিকে (বিধিমালা ২০০৯) আমি আইন মনে করি না। কিন্তু যারা মনে করে তাদের জন্য তো সে ফিট ক্যান্ডিডেট। সে মাদ্রাসা থেকে পাস করা, তাকে দেবেন না কেন?

সামাজিক প্রতিবন্ধকতা: ভারতের উদাহরণ
নারীর নিকাহ রেজিস্ট্রার হওয়া না হওয়া সংক্রান্ত রায়ে আদালত সামাজিক প্রতিবন্ধকতার কথা উল্লেখ করেছেন।

এক্ষেত্রে ভারতীয় সুপ্রিম কোর্টের একটি রেফারেন্সে নজর দেওয়া যেতে পারে। ভারতীয় সশস্ত্র বাহিনীতে চিকিৎসা পরিষেবার বাইরে অন্য ভূমিকায় নারীদের নিয়োগ শুরু হয় ১৯৯২ সালে। কিন্তু ২০২০ সাল পর্যন্ত স্থায়ী কমিশনড অফিসার পদে কাজ করার সুযোগ তারা পাননি।

এ নিয়ে দিল্লি হাইকোর্টে আবেদন করে সশস্ত্র বাহিনীতে যুদ্ধ করার এবং কমান্ডিং অফিসার পদে নিয়োগ পাওয়ার অধিকার আদায় করেছিলেন সশস্ত্র বাহিনীর ৫৭ জন নারী। কিন্তু হাইকোর্টের রায়কে চ্যালেঞ্জ জানিয়ে সুপ্রিম কোর্টে আবেদন করেছিল কেন্দ্রীয় সরকার। ২০১০ সাল থেকে সেই আবেদন বিচারাধীন ছিল। এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্ট প্রশ্ন করেন: হাইকোর্টের রায়ের ওপর তো শীর্ষ আদালত স্থগিতাদেশ দেননি। তাহলে কেন নির্দেশটি এর আগে কার্যকর করা হয়নি? আদালতে কেন্দ্রীয় সরকার যুক্তি দেখায়, সেনাবাহিনীর সদস্যদের একটি বড় অংশ আসেন প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল থেকে। তাই নারী কর্মকর্তাদের নির্দেশ পালনের মতো উপযুক্ত মানসিকতা তাদের মধ্যে তৈরি হয়নি।

এমনকি দৈহিক গঠন সংক্রান্ত সীমাবদ্ধতার কারণে মেয়েরা যুদ্ধ করার যোগ্য নন বলেও আদালতে দাবি করে ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার। মাতৃত্ব, শিশু পরিচর্যা, যুদ্ধক্ষেত্রে বিপক্ষের হাতে ধরা পড়ার বিপদ ইত্যাদি প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়। এসব যুক্তি নিয়ে কেন্দ্রকে তীব্র ভৎর্সনা করেন সুপ্রিম কোর্ট। আদালত বলেন, ‘পুরুষদের সঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করেন নারীরা। কেন্দ্রের যুক্তি পুরনো গৎবাঁধা ধারণাপ্রসূত এবং লিঙ্গ বৈষম্যমূলক। নারী সেনা অফিসাররাও দেশের সম্মান বৃদ্ধি করেছেন।’

আইন কী বলছে
নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেবে কাজের যোগ্যতা এবং এর যাবতীয় বিষয়াবলী উল্লেখ রয়েছে মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ এ। ওই বিধিমালার বিধি-৮ এ নিকাহ ও তালাক রেজিস্ট্রারের যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে। সেখানে বলা হচ্ছে–

i) আলীম সার্টিফিকেটধারী;
ii) সর্বনিম্ন ২১ এবং সর্বোচ্চ ৪০ বছর বয়স্ক; এবং
iii) সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা

মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ এর বিধি ২২ বলছে: ‘‘২২। নিকাহ্ রেজিস্ট্রি-পূর্ব কার্যক্রম।⎯(১) নিকাহ্ রেজিস্ট্রি করিবার পূর্বে নিকাহ্ রেজিস্ট্রার পক্ষদ্বয়ের মধ্যে নিকাহ্ অনুষ্ঠিত হইয়াছে মর্মে সন্তুষ্ট হইবার জন্য সংশ্লিষ্ট পক্ষদ্বয়কে জিজ্ঞাসাবাদ করিবেন অথবা নিকাহ্ অনুষ্ঠানের সময় উপস্থিত ছিলেন এমন দুইজন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করিবেন, তবে কনে পর্দানশীল হইলে, তৎপরিবর্তে তাহার পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত উকিলকে জিজ্ঞাসাবাদ করিতে হইবে।

(২) নিকাহ রেজিস্ট্রার স্বয়ং বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করিলে, তিনি নিকাহ্ রেজিস্টারের সংশ্লিষ্ট কলামসমূহ পূরণ করিবেন এবং রেজিস্টারে যে সকল ব্যক্তির স্বাক্ষর লাগিবে তাহাদের স্বাক্ষর গ্রহণ করিবেন এবং উহার পর নিজে স্বাক্ষর প্রদান করিয়া সিলমোহরাঙ্কিত করিবেন, তবে নিরক্ষর ব্যক্তির ক্ষেত্রে রেজিস্টারের নির্দিষ্ট স্থানে তাহার বৃদ্ধাঙ্গুলের ছাপ বা টিপসহি গ্রহণ করিতে হইবে এবং একজন সত্যায়নকারী সাক্ষী কর্তৃক তাহার পূর্ণ নাম লিপিবদ্ধ করিতে হইবে।

(৩) নিকাহ রেজিস্ট্রার ব্যতীত অন্য কেহ বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন করিলে, উক্ত ব্যক্তি বিবাহের পনের দিনের মধ্যে উক্ত এলাকার নিকাহ্ রেজিস্ট্রারকে বিষয়টি অবহিত করিবেন এবং এইরূপ ক্ষেত্রে যে ব্যক্তি নিকাহ্ পড়াইয়াছেন তিনি নিকাহ্ নিবন্ধনের জন্য রেজিস্টারে যে সকল ব্যক্তির স্বাক্ষর প্রয়োজন তাহাদেরকে সঙ্গে লইয়া সংশ্লিষ্ট নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের নিকট হাজির হইবেন।’’

ফাওজিয়া করিম বলেন: এখানে মুসলিম ম্যারেজ রেজিস্ট্রারের যে যোগ্যতার কথা বলা হয়েছে, তাতে শুধু পুরুষরাই রেজিস্ট্রার হতে পারবেন বা নারীরা এ কাজ করতে পারবেন না তা উল্লেখ নেই। এ বিধি মোতাবেক উপরোক্ত তিনটি যোগ্যতা থাকলেই বাংলাদেশের একজন নাগরিক মুসলিম ম্যারেজ রেজিস্ট্রার হতে পারবেন। তাকে বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করার যোগ্যতা সম্পন্ন হতেই হবে এমন কথা নেই।

এ ধারা কি সাংঘর্ষিক?
মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ এর ধারা ২২ এ বলা হয়েছে ‘…তবে কনে পর্দানশীল হইলে, তৎপরিবর্তে তাহার পক্ষে দায়িত্বপ্রাপ্ত উকিলকে জিজ্ঞাসাবাদ করিতে হইবে।‘ এর অর্থ কি রেজিস্ট্রার পুরুষই হবেন তা বোঝাচ্ছে না? রেজিস্ট্রার নারী হলে তো কনের পর্দানশীন হওয়ার প্রশ্ন আসতো না।

এমন প্রশ্নের জবাবে ফাওজিয়া করিম বলেন: আইন প্রণেতারাও ধরেই নিয়েছেন নিকাহ রেজিস্ট্রার পুরুষ হবেন। আমরা এ বিষয়টিও সংশোধনের জন্য আদালতের নজরে আনবো।

নারী ম্যাজিস্ট্রেটও সম্পন্ন করেন ‘কোর্ট ম্যারেজ’
কোর্ট ম্যারেজ বলতে আইনে কোনো বিধান না থাকলেও শব্দটি লোকমুখে বহুল প্রচলিত। কোর্ট ম্যারেজ মূলত হলফনামার মাধ্যমে স্বামী-স্ত্রীর বিয়ের ঘোষণা দেওয়া। এ হলফনামা ননজুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে লিখে নোটারি পাবলিক বা প্রথম শ্রেণির ম্যাজিস্ট্রেটের সামনে সম্পন্ন করা হয়ে থাকে। আর হলফের কাজটি একজন নারী ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারি পাবলিক সম্পন্ন করতে পারেন। প্রচলিত অর্থের কোর্ট ম্যারেজ যদি নারী ম্যাজিস্ট্রেট সম্পন্ন করতে পারেন, তাহলে নিকাহ রেজিস্ট্রি কেন নারীরা করতে পারবেন না?

অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম বলেন: কোর্ট ম্যারেজ বলতে আইনে কিছু নেই। এটা প্রাপ্তবয়স্ক দু’জন নারী-পুরুষের বিয়ে সংক্রান্ত হলফনামা। এ কাজটি নারী-পুরুষ সবাই করতে পারেন। এ রায়ে একজন মাননীয় নারী বিচারপতিও ছিলেন। নারীরা কি শুধু বিচারপতি হিসেবে কাজ করছেন? প্রধানমন্ত্রী হিসেবে একজন নারী দেশকে নেতৃত্ব দিয়ে যাচ্ছেন। স্পিকার হিসেবে নারী সংসদ পরিচালনা করছেন। বিরোধী দলীয় নেতা হিসেবে নারীরা দল পরিচালনা করছেন। নারী মেজর জেনারেল ও পাইলট যদি কথিত ‘ডিসকোয়ালিফিকেশন’ নিয়ে যথাযথভাবে স্বীয় দায়িত্ব পালন করতে পারেন, তাহলে নিকাহ্ রেজিস্ট্রার হিসেবে কেন নারীরা আসতে পারবেন না? উচ্চ আদালত রায়টি পুনর্বিবেচনা করবেন বলে আশা করি।

শেখ সাইফুজ্জামান বলেন: কোর্ট তার পর্যবেক্ষণে স্পষ্টভাবে বলেছেন, অন্যান্য পাবলিক অফিসের চেয়ে নিকাহ্ রেজিস্ট্রারের রোল সম্পূর্ণ আলাদা। একজন নারী ম্যাজিস্ট্রেট বা নোটারী পাবলিক উপস্থিত না থাকলে এর বিকল্প রয়েছে। মাননীয় বিচারপতি বা অন্যান্যদের বেলায়ও বিকল্প রয়েছে। কিন্তু একটি এলাকায় নিকাহ্ রেজিস্ট্রার একজনই। তার বিকল্প বা ভারপ্রাপ্ত হিসেবে অন্য কাউকে দিয়ে কাজ করানোর সুযোগ আইনে উল্লেখ নেই।

সংবিধান কী বলছে
অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম বলছেন: বাংলাদেশের সংবিধানেও নারী-পুরুষের সমতার কথা বলা হয়েছে। সেখানে কথিত সামাজিক প্রতিবন্ধকতা বলতে কিছু নেই।

সংবিধানে বলা হয়েছে: ‘‘১৯৷ (১) সকল নাগরিকের জন্য সুযোগের সমতা নিশ্চিত করিতে রাষ্ট্র সচেষ্ট হইবেন।

(৩) জাতীয় জীবনের সর্বস্তরে মহিলাদের অংশগ্রহণ ও সুযোগের সমতা রাষ্ট্র নিশ্চিত করিবেন।’’

এছাড়াও বলা হয়েছে: ‘‘২৭। সকল নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং আইনের সমান আশ্রয় লাভের অধিকারী।

২৮। (১) কেবল ধর্ম, গোষ্ঠী, বর্ণ, নারীপুরুষভেদ বা জন্মস্থানের কারণে কোন নাগরিকের প্রতি রাষ্ট্র বৈষম্য প্রদর্শন করিবেন না।

(২) রাষ্ট্র ও গণজীবনের সর্বস্তরে নারী পুরুষের সমান অধিকার লাভ করিবেন।’’ সুতরাং নিকাহ রেজিস্ট্রার হিসেব নারী-পুরুষের বিভেদ হতে পারে না।

তবে ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল শেখ সাইফুজ্জামান বলেন: পার্লামেন্টে আইন প্রণেতারা আইন পাস করেন। আইনের ব্যাখ্যা করেন আদালত। এখানে নারী-পুরুষের উল্লেখ না থাকলেও আদালত তার পর্যবেক্ষণে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। আপিল বিভাগ যেহেতু এখানে এখনও ইন্টারফেয়ার করেননি সেহেতু এটাই এখন আইন। এছাড়া সংবিধানের ২৯ ধারা এখানে প্রযোজ্য নয়। কারণ, মুসলিম বিবাহ ও তালাক (নিবন্ধন) বিধিমালা, ২০০৯ অনুযায়ী ‘নিকাহ্ রেজিস্ট্রার পদ সরকারী চাকরি না।’

নারী নিকাহ রেজিস্ট্রার হতে আইনি লড়াই করছেন আয়েশা সিদ্দিকা। ছবি: বিবিসি বাংলা