ইসলাম ও মহানবী (ﷺ) সম্পর্কে জর্জ বার্নার্ড শ’র স্মরণীয় কয়েকটি মন্তব্য ইসলাম বিদ্বেষীরা তাঁর থেকে শিক্ষা নিতে পারে

আজ নোবেল-জয়ী বিখ্যাত আইরিশ চিন্তাবিদ ও সাহিত্যিক জর্জ বার্নার্ড শ’র ৭০ তম মৃত্যু-বার্ষিকী। ১৯৫০ সালের এই দিনে (২ নভেম্বর) তিনি মারা যান।
প্রখ্যাত এই নাট্যকার মহানবী (ﷺ)’র প্রতি গভীর শ্রদ্ধা দেখানোর জন্যও বিশেষভাবে খ্যাত। ১৯৩৬ সনে প্রকাশিত ‘প্রকৃত ইসলাম বা দ্য জেনুয়িন ইসলাম’ শীর্ষক বইয়ে তিনি লিখেছেন:
‘মুহাম্মদ (ﷺ)’র ধর্মের প্রতি আমি সবসময়ই সুউচ্চ ধারণা পোষণ করি, কারণ এর চমৎকার প্রাণবন্ততা। আমার কাছে মনে হয় এটাই একমাত্র ধর্ম যেটা সদা পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার সাথে অঙ্গীভূত হওয়ার ক্ষমতা রাখে যা প্রত্যেক যুগেই মানুষের হৃদয়ে আবেদন রাখতে সক্ষম। আমি তাঁর (মুহাম্মদ – ﷺ ) সম্বন্ধে পড়াশোনা করেছি- চমৎকার একজন মানুষ এবং আমার মতে তাঁকে অবশ্যই মানবতার ত্রাণকর্তা বলতে হবে।’
বার্নার্ড ‘শ আরো লিখেছেন: মুহাম্মাদ (ﷺ) নবীদের মধ্যেও শ্রেষ্ঠ। … মধ্যযুগের খ্রিস্টান পাদ্রিরা অজ্ঞতার কারণে অথবা বিদ্বেষের কারণে তাঁর সম্পর্কে অন্ধকার চিত্র তুলে ধরত। তারা হিংসা ও বিদ্বেষের কারণেই মুহাম্মাদ (ﷺ)-কে খ্রিস্ট-বিরোধী বলে মনে করত। আমার মতে তিনি তো খ্রিস্ট বিরোধী ননই বরং তাঁকে মানবতার মুক্তিদাতা বলা উচিত।
ইংরেজি সাহিত্যে শেক্সপিয়ারের পর শ্রেষ্ঠ নাট্যকার হিসেবে খ্যাত জর্জ বার্নার্ড ‘শ আরও বলেছেন: আমি বিশ্বাস করি মুহাম্মদ (ﷺ)-র মতো ব্যক্তির কাছে যদি আধুনিক বিশ্বের শাসনের একচ্ছত্র কর্তৃত্ব অর্পণ করা হতো তবে তিনি বন্ধুত্ব ও শান্তির মাধ্যমে সংকট ও সমস্যাগুলো সমাধান করতেন কিংবা এমন সাফল্যের সঙ্গে সমাধান করতেন যা বহু প্রতীক্ষিত শান্তি ও সুখ নিয়ে আসতো। মুহাম্মাদ ছিলেন পৃথিবীতে পদার্পণ করা মানুষদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ। মুহাম্মাদ (ﷺ) মানুষকে ধর্মের দিকে ডেকেছেন। তিনি একটি সভ্যতার গোড়া-পত্তন করেছেন। তিনি একটি জাতির প্রতিষ্ঠাতা। তিনি নৈতিকতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছেন। মুহাম্মাদ (ﷺ) একটি প্রাণবন্ত ও শক্তিশালী সমাজ গড়ে তুলেছেন যাতে তাঁর শিক্ষাগুলোকে বাস্তবতার ময়দানে আনা হয়। তিনি মানবীয় আদর্শ ও আচরণকে চিরকালের জন্য ও পরিপূর্ণভাবে বদলে দিয়েছেন। আমি ভবিষ্যদ্বাণী করছি যে মুহাম্মদ (ﷺ)’র ধর্মবিশ্বাস আগামীদিনের ইউরোপের কাছে গ্রহণযোগ্য হবে, ইতোমধ্যেই তা পেতে শুরু করেছে।
আইরিশ লেখক বার্নার্ড শ মনে করেন মানবীয় সভ্যতা ও নৈতিকতাকে এগিয়ে নেয়ার ক্ষেত্রে মহানবীর (ﷺ) ভূমিকা অনস্বীকার্য এবং মানব জাতি মহানবীর সেবা ও শিক্ষার কাছে চিরঋণী। ‘শ এ প্রসঙ্গে বলেছেন:
আমি সব সময়ই মুহাম্মাদের (ﷺ) ধর্মের বিস্ময়কর প্রাণবন্ততার কারণে এ ধর্মের প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা রাখি। আমার মতে ইসলামই একমাত্র ধর্ম যার এতসব বৈশিষ্ট্য আছে যে তা পরিবর্তনশীলতাকে নিজের মধ্যে আকৃষ্ট করতে পারে এবং এ ধর্ম সব যুগের সব গঠন ও রূপের সঙ্গে নিজেকে সাদৃশ্যপূর্ণ করে নিতে পারে। অন্য কথায় এ ধর্ম সদা-পরিবর্তনশীল জীবনযাত্রার সাথে অঙ্গীভূত হওয়ার ক্ষমতা রাখে যা প্রত্যেক যুগেই মানুষের হৃদয়ে আবেদন রাখতে সক্ষম। … বিশ্বের মানুষ জীবন-ঘনিষ্ঠ ও বুদ্ধিবৃত্তি-কেন্দ্রীক এক আধ্যাত্মিকতার সন্ধান করছে, কিন্তু এই আধ্যাত্মিকতাকে তারা ইসলাম ছাড়া আর অন্য কোথাও খুঁজে পাবে না।
শ্রেষ্ঠ ও অতুলনীয় মহামানব হযরত মুহাম্মাদ (দরূদ)’র প্রশংসা করে বার্নার্ড ‘শ আরও বলেছেন:
তাঁর নাম মুহাম্মাদ। ৫৭০ খ্রিস্টাব্দে আরবে তাঁর জন্ম হয়েছিল। তাঁর রোসালাত শুরু হয় ৪০ বছর বয়সে যখন তিনি সত্য ধর্ম ইসলামের দাওয়াত শুরু করেন এবং ৬৩ বছর বয়সে তিনি দুনিয়াকে বিদায় জানান তথা ইহলোক ত্যাগ করেন। এই সংক্ষিপ্ত ২৩ বছর সময়ে তিনি নবুওত লাভ থেকে এক খোদার ইবাদতের পথপ্রদর্শকে পরিণত হন। তিনি মানুষকে গোত্রীয়-যুদ্ধ হতে মুক্ত করেন এবং তাদের মধ্যে ঐক্য ও জাতীয় সংহতি গড়ে তোলেন। এ সময়ের মধ্যে তিনি জনগণকে নৈরাজ্যপনা ও উন্মাদনা থেকে ভারসাম্য ও খোদাভীতির দিকে, অনাচার ও অনিয়ম থেকে সুশৃঙ্খল জীবনের দিকে এবং চরম অধঃপতন থেকে সর্বোচ্চ নৈতিক মূল্যবোধের দিকে পথ দেখান। মহানবী মানব-ইতিহাসকে এমন পরিপূর্ণভাবে বদলে দিয়েছেন যে মহানবী (ﷺ)’র আগে বা পরে কিংবা অন্য কোনো স্থানে কোনো মাত্র এক ব্যক্তির মাধ্যমে এমন পরিবর্তন আর কখনও ঘটেনি। ইসলামের ইতিহাসের প্রথম এই দুই দশকে এমন সব বিস্ময়কর ঘটনা ঘটেছে যে তা অবিশ্বাস্য মনে হয়।
বার্নার্ড শ’ আরও লিখেছেন, ‘মহানবীর (ﷺ) জীবনী পড়লে বোঝা যায় তাঁর জীবন ছিল এমন সব সৌন্দর্যে ভরপুর যে তা সবাইকে আকৃষ্ট করত। মহানবী ছিলেন দুই জগত তথা সমগ্র বিশ্ববাসীর জন্য রহমত বা অনুগ্রহ এবং উন্নত চরিত্র ও গুণগুলোকে পরিপূর্ণতা দেয়ার জন্যই তাঁকে পাঠানো হয়েছে। তাঁর দিকে তাকালে তাঁর অভ্যন্তরীন ন্যায়বিচারের ছবি দেখা যায়। তাঁর দয়ার্দ্র আচরণ তাঁর আত্মার বিশালত্বের সাক্ষ্য দেয়। তিনি কেবল নিজ প্রতিপালকের সন্তুষ্টির জন্যই রাগ হতেন ও খুশি হতেন আত্মতুষ্টির জন্য নয়। তাঁর বসার মধ্যে দেখা যেত আদব ও নম্রতা, তাঁর নীরবতার মধ্যে থাকত প্রজ্ঞা বা হিকমাত, তাঁর লজ্জা ছিল অবর্ণনীয়, ধনী ও দরিদ্রের মধ্যে তিনি কোনো পার্থক্য করতেন না, তাঁর কাছে পার্থক্যের মানদণ্ড ছিল কেবলই খোদাভীতি। তাঁর মুখে সব সময় প্রকাশ পেত সত্য আর মুখে লেগে থাকত মুচকি হাসি। তিনি ছিলেন বিনম্রতম মানুষ।’
আজকের ইউরোপের ম্যাক্রঁ বা অনুরূপ নেতারা ইসলাম-ফোবিয়া বা ইসলাম-আতঙ্ক ছড়িয়ে দেয়ার চেষ্টা করলেও বা কোনো মুসলমানের উগ্রতাকে লক্ষ্য করে ইসলামকেই সন্ত্রাসবাদের সমার্থক হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করলেও অন্য অনেক পশ্চিমা মহান মনীষীর মত বার্নার্ড শ’ও
মহানবীর দরূদ) জীবন অধ্যয়ন করে ও তাঁর বিশেষ গুণগুলো সম্পর্কে মন্তব্য করতে গিয়ে বলতে বাধ্য হয়েছেন যে,
‘তাঁর বিস্ময়কর জীবন আমার ওপর বিস্ময়কর প্রভাব ফেলেছে। তাঁর ধর্মই হচ্ছে একমাত্র ধর্ম যা সব যুগের মানুষের জন্য উপযুক্ত ও সব যুগের মানুষকেই আকৃষ্ট করার ক্ষমতা রাখে।’ ওপারে ভালো থাকুন শ।
googel
বিজ্ঞাপন