১৪ দলের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমুকে অভিনন্দন

বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম
সাইদুর রহমান মিন্টু
বিজ্ঞাপন

আমরা যে যাই বলি, স্বাধীনতার পর একমাত্র কৃষকই জাতীয় উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি অবদান রেখেছে। মুক্তিযুদ্ধের আগে আমাদের খাদ্য উৎপাদন ছিল ৭০-৮০ লাখ টন; যা আজ ৪ কোটি টনে উন্নীত হয়েছে। সাড়ে ৭ কোটি মানুষের খাদ্য নিয়ে ছিল টানাটানি, আজ ১৮ কোটিতেও খাদ্য ঘাটতি নেই- এটা কৃষকের অবদান, কৃষির সঙ্গে জড়িত বিজ্ঞানের অবদান। কিন্তু এ কৃষিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে সব থেকে কম। কৃষি সম্পর্কে জানাশোনা কাউকে খুব একটা কৃষি মন্ত্রণালয়ে আনা হয়নি। মাঝেমধ্যে যখন দেখি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে লেখাপড়া করে পুলিশের অফিসার- বুকের ভিতর মোচড় দিয়ে ওঠে, তুমি যদি পুলিশই হবে তাহলে কেন কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ে রাষ্ট্রের সম্পদ ধ্বংস করলে? কৃষিতে ভূমিকা রাখার জন্য কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, পুলিশ হওয়ার জন্য নয়। কিন্তু কে শোনে কার কথা! বর্তমান কৃষিমন্ত্রী ড. আবদুর রাজ্জাক মুক্তিযুদ্ধে কাদেরিয়া বাহিনীতে ছিলেন। ভালো ভূমিকা রেখেছেন। নানা হাটঘাট ঘুরেফিরে শেষ পর্যন্ত কৃষি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব পেয়েছেন। আমার মনে হয় কৃষি নিয়ে লেখাপড়া করা ড. আবদুর রাজ্জাকই একমাত্র কৃষিমন্ত্রী। করোনায় তাঁর সামনে যে চ্যালেঞ্জ, মনে হয় তাও তিনি সফলতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারবেন। তাঁর আগে কৃষিমন্ত্রী ছিলেন মতিয়া চৌধুরী। চোখ-মুখ খিচিয়ে বক্তৃতা করতে তিনি বিশ্ববিখ্যাত। কিন্তু কৃষি সম্পর্কে তাঁর তেমন জ্ঞান ছিল না। ভালো গৃহবধূরা লাউ-কুমড়া-ডাঁটা-ঝিঙা নানা তরিতরকারি বুনতে পারে, কিন্তু বেগম মতিয়া চৌধুরী তাও পারতেন না। ড. আবদুুর রাজ্জাক, শওকত মোমেন শাজাহান, বগুড়ার মান্নান, সখীপুরের মকবুল হোসেন খোকা, যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী প্রদীপ যখন ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ত তখন জিয়াউর রহমানের ‘খাল কাটা কর্মসূচি’ চলছিল। স্বেচ্ছাশ্রমে শম্ভুগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র খননে মাঝেমধ্যেই সবাইকে উজ্জীবিত করতে মতিয়া চৌধুরী বক্তৃতা করতেন। বঙ্গবন্ধুর ব্যর্থতা নিয়ে সে যে কি দুর্দান্ত বক্তৃতা যার স্বকণ্ঠ রেকর্ড এখনো আমার কাছে আছে। দুর্ভাগ্য, আমাদের প্রিয় বোনকে পেয়ে এরাও তাঁর মন্ত্রিসভায় দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। এই প্রথম কৃষি নিয়ে লেখাপড়া করা ড. আবদুর রাজ্জাক মন্ত্রী হয়েছেন। তাই আশা করব, এ দুর্যোগময় অবস্থায়ও তিনি সফলকাম হবেন।

করোনায় গৃহবন্দী, তেমন কাজ নেই। তাই পরিমাণের চাইতে বেশি টিভি দেখি। সেদিনও দেখছিলাম। মনে হয় সেটা সংসদ অধিবেশনের সমাপনী দিন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী একসময় বললেন, ‘চোর ধরে আমরাই যেন চোর হতে চলেছি।’ তাঁর কণ্ঠে যে খেদ, যে যন্ত্রণা ছিল অমন যন্ত্রণা আমি দিল্লির পান্ডারা রোডে মাঝেমধ্যে দেখতাম। সত্যিই খুব খারাপ লেগেছে। বঙ্গবন্ধুর কন্যার সরকার যেখানেই অনিয়ম খুঁজতে গিয়েছে, যাকে ধরেছে খুঁজে পেতে দেখা গেছে সিংহভাগই আওয়ামী লীগ। এত রাজনৈতিক বিরোধী, এত প্রতিহিংসা এর মধ্যেও বিএনপি ও জামায়াতের খুব বেশি লোক ধরা পড়েনি, ধরা হয়নি। তাই মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যত কষ্টই পান বাস্তব হলো, যেভাবেই হোক সব দলের-মতের-পেশার-ধর্মের লোক তাঁর দলে আশ্রয় নিয়েছে। স্বাধীনতার পর যেমন প্রায় সব স্বাধীনতাবিরোধী, আড়াল থেকে স্বাধীনতাযুদ্ধে প্রবল ভূমিকা পালনকারী মুজিব বাহিনীসহ অনেকেই জাসদে যুক্ত হয়েছিল। একদিকে সেই জাসদে আশ্রয় নিয়ে মুসলিম লীগ, জামায়াত নেতারা আলোয় আসতে চেয়েছিলেন; অন্যদিকে চাচা-চাচি, খালা-খালু নানান পরিচয়ে আওয়ামী লীগ হয়ে গিয়েছিল। স্বাধীনতার পর তেমন একটা স্বাধীনতাবিরোধী ছিল না, সবাই স্বাধীনতাপ্রেমী। ২৪ ডিসেম্বর, ’৭১ আমাদের হাতে যে ১৫-১৬ হাজার রাজাকার বন্দী ছিল তাদের নিঃশর্ত মুক্তি দেওয়া হয়। বিকাল ৪টা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ‘জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু, জয় কাদের সিদ্দিকী’ স্লোগানে কালিয়াকৈর থেকে জামালপুর-শেরপুর পর্যন্ত আলোড়িত হচ্ছিল। রাজাকারের কণ্ঠে ‘জয় বাংলা, জাতির পিতা শেখ মুজিব’ স্লোগান যে কত গগনবিদারী হতে পারে তা সেদিন উপলব্ধি করেছিলাম। ঠিক তেমনি মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যত বিরক্তই হোন, শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে সরকারি দলে ব্যাপক আগাছার সমারোহ ঘটে। তাই ঘটেছে বর্তমান সরকারে। কাজী শহীদ ইসলাম পাপুল এমপি হয়ে মানব পাচারকারী- এর চাইতে জঘন্য আর কী হতে পারে? টাকার জোরে ভদ্রলোক এমপি হয়েছেন তো হয়েছেনই, বউকেও এমপি বানিয়েছেন। টাকায় কী না করে? বঙ্গবন্ধুর সময় কিশোরগঞ্জের জহিরুল ইসলাম ছিলেন সবচেয়ে বড় ধনী। তিনি দু-চারটা লাইসেন্স পারমিট পেতে পারতেন। কিন্তু জীবন পাত করেও মন্ত্রী-এমপি হতে পারতেন না। অথচ আজকাল সব হওয়া যায়! কদিন থেকে শুনছি রিজেন্ট হাসপাতালের কর্মকান্ড! করোনার ভুয়া সার্টিফিকেট বা ছাড়পত্র- আমাদের যা চিন্তায়ও আসে না। এমন লুটেরারা সরকারি নিরাপত্তা নিয়ে ভেঁপু বাজিয়ে চলাফেরা করে। শুধু নিজে না, বউকে নিয়েও চলাফেরায় কোনো বাধা নেই- এ এক আজব সমাজ, আজব সমাজব্যবস্থা! এখনো ধরা পড়েনি। কি ধরা পড়বে, দারোগার ঘরে চোর পালালে কি আর ধরা পড়ে? মন্ত্রী কাশেমের ঘরে খুনি ইমদু পালিয়ে ছিল। একসময় তার মন্ত্রিত্ব গিয়েছিল।

রিজেন্ট হাসপাতালের মালিক সাহেদ যে কার ঘরে পালিয়েছে শেষ পর্যন্ত কী হবে জানি না। মাননীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেছেন, দু-এক দিনের মধ্যেই সাহেদ ধরা পড়বে। তাঁর কথা বিশ্বাস করি। তাঁর বাড়িতে যে এ মহাঠগ পালিয়ে নেই, তা দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারি। তাই যতক্ষণ এসব সুবিধাবাদীকে শায়েস্তা করা না যাবে ততক্ষণ মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শত চেষ্টা তেমন কোনো ফল দেবে না। তবে অতিসম্প্রতি প্রয়াত মোহাম্মদ নাসিমের জায়গায় আমির হোসেন আমুকে ১৪ দলের সমন্বয়কারী করা শুভলক্ষণ মনে হচ্ছে। আমাদের সবকিছু আছে, শুধু নেই একে অন্যের প্রতি আস্থা ও বিশ্বাস, শুধু নেই রাজনীতি। গণতান্ত্রিক সমাজে রাজনীতি না থাকলে সামাজিক ব্যবস্থায় যা হয় আমাদের অবস্থা তার চেয়ে ভিন্ন কিছু হতে পারে না, হয়ওনি। জনাব আমির হোসেন আমু একজন পোড় খাওয়া রাজনীতিক। আমাদের দেশে এখন দলীয় নেতার ছড়াছড়ি। কিন্তু জাতীয় নেতা খুব একটা বেশি নেই। সে ক্ষেত্রে অন্যতম প্রধান জাতীয় নেতা হিসেবে আমির হোসেন আমুকে বিবেচনা করা যেতে পারে। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ আর জাতীয় নেতা নন, কেউ স্বীকার করুক আর না করুক তিনি এখন একজন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক নেতা। তাই জনাব আমির হোসেন আমুর ১৪ দলের সমন্বয়কারী হিসেবে মনোনীত হওয়ায় যদি রাজনীতি সচল হয় বুক ভরে রাজনীতি শ্বাস নিতে পারে সেটা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্য খুবই আনন্দ ও কল্যাণের হবে। জনাব আমির হোসেন আমুকে প্রায় অর্ধশতাব্দী ধরে জানি, চিনি। তাঁর জাতীয় রাজনীতি নিয়ে চিন্তা-ভাবনা, মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা এখানে এনেছে। দলীয় ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন বহুবার। তিনি তাঁর দুর্বার নিষ্ঠায় বারবার ষড়যন্ত্রকে পরাজিত করেছেন। আমি ভারতে থাকতে আমার প্রতি তাঁর অযথা অজানা বিদ্বেষ ছিল। তা কী করে এক তীব্র আকর্ষণে পরিণত হয়েছে শত চেষ্টা করেও বলতে পারব না। যেবার জিল্লুর রহমান আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হলেন সেবার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউটে সারা রাত সাবজেক্ট কমিটির সদস্যদের মতামত নেওয়া হয়েছিল। প্রার্থী ছিলেন আমির হোসেন আমু, সাজেদা চৌধুরী, জিল্লুর রহমান। তোফায়েল আহমেদও হয়তো কারও কারও কাছে আলোচিত প্রার্থী ছিলেন। সাবজেক্ট কমিটি ছিল সবকটি জেলার সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক এবং আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটি নিয়ে। আমার ডাক পড়েছিল রাত পৌনে ৪টায়। বলেছিলেন, ‘বজ্র! সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তুমি কাকে চাও?’ বলেছিলাম, যদি শক্তিশালী সংগঠন চান তাহলে আমির হোসেন আমুর চাইতে যোগ্য প্রার্থী আর কেউ নেই। সভানেত্রী বলেছিলেন, ‘কোনো জেলা তো তাঁকে সমর্থন করে না। কী করে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে তাঁকে নেওয়া যায়?’ বলেছিলাম, আপনার সঙ্গে তর্ক করতে চাই না। কেন্দ্রীয় কমিটিতে তাঁর ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ হবে কিনা জানি না। ২-১ ভোটে জয়ী অথবা পরাজিত হতে পারেন। কিন্তু সবকটি জেলায় ৯০ ভাগ সভাপতি-সাধারণ সম্পাদকের সমর্থন তিনি পাবেন। আমি জোর দিয়ে বলতে পারি এ পর্যন্ত যে ৫৩টি জেলা আপনার সঙ্গে সাক্ষাৎ দিয়েছে তার ৪৭টি জেলাই আমির হোসেন আমুকে সমর্থন করেছে। এই ৪৭-এর দু-তিন জন হয় সাধারণ সম্পাদক, না হয় সভাপতির আপত্তি থাকলেও থাকতে পারে। সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিস্মিত হয়ে বলেছিলেন, ‘বল কী বজ্র! সাক্ষাৎকার নিচ্ছি আমি আর হিসাব দিচ্ছ তুমি?’ বলেছিলাম, সবই যোগাযোগ, সবই অভিজ্ঞতার ফসল। তিনি সঙ্গে সঙ্গে চা এনে খাইয়েছিলেন। বলেছিলেন, ‘শতকরা ৭০ ভাগ আমির হোসেন আমুর পক্ষে। কিন্তু তাঁকে সাধারণ সম্পাদক বানাতে পারব না। সবার আগে কথাটা তোমাকে বলে রাখলাম।’

আমির হোসেন আমুর আরেকটা ঘটনা বলি। সময়টা মনে নেই। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে তখন আমার সম্পর্ক খুবই ভালো। কোনো অসুবিধা হলেই ডাকাডাকি করতেন, বুদ্ধি-পরামর্শ চাইতেন। কারণ তিনি জানতেন আমি কখনো কোনো দিকে ঝোল টেনে পরামর্শ দেব না। তাঁর কাছে গেলে বললেন, ‘বজ্র! একটা অসুবিধায় পড়েছি। প্রায় তিন মাস হয়ে গেল আমু ভাই আসছেন না। ফোন করলে ধরেন না। তোমাকে তো তিনি বেশ সম্মান করেন, ভালোবাসেন। একটু যাও তো তাঁকে বুঝিয়ে -সুজিয়ে আনতে পারো কিনা।’ সভানেত্রীর কাছ থেকে ফিরে ফোন করেছিলাম। তখনো খুব একটা মোবাইল ফোন চালু হয়নি, তাই বাসা থেকে করেছিলাম। বলেছিলাম, আমি আসছি। তিনি বললেন, ‘তা আবার বলতে হবে? আপনার আসার অনুমতির দরকার আছে!’ দুপুরে গিয়েছিলাম। গিয়ে দেখি খাবার টেবিল সাজিয়ে রেখেছেন। আমির হোসেন আমুর ইস্কাটনের বাড়িতে যতবার গেছি অসাধারণ যত্ন করেছেন। সেদিনও খেতে বসতে বসতেই জিজ্ঞাসা করলেন, ‘হঠাৎ ভাইকে মনে পড়ল!’ বলেছিলাম, না, ঠিক তা নয়। সভানেত্রী ডেকেছিলেন। তিনি বললেন আপনি নাকি গত তিন-চার মাস তাঁর কাছে যান না। তখন বললেন, ‘কী যাব? মাঝেমধ্যে বড় খারাপ ব্যবহার করেন। তাই ভালো লাগে না, যাই না। কোনো কাজ থাকলে তিনি যদি ডাকেন তাহলে যাব, কোনো কাজ না থাকলে কেন যাব?’ সেখান থেকে বিকালে সভানেত্রীর কাছে গিয়েছিলাম। স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতে সভানেত্রী বলেছিলেন,
– কেন আসেন না?

– আমু ভাই বলেছেন, কী আসব, মাঝেমধ্যে আপনার ব্যবহার ভালো লাগে না।

– অন্যরা তো আসে। আমির হোসনে আমু একটা মারাত্মক কথা বলেছিলেন। বলেছিলেন,

– সভানেত্রী! আমি আসি আপনার কাজ করতে, আপনাকে সহযোগিতা করতে। আর অন্যরা এসে ঘোষ পাড়ে তারা তাদের স্বার্থে। আমি তো আমার স্বার্থে আসি না। আপনার স্বার্থ, দেশের স্বার্থকে মনে করি আমার স্বার্থ। এ ছাড়া আমার কোনো স্বার্থ নেই।

সেই যে ছোট্ট দূরত্বটা দূর হয়েছিল আর কখনো হয়নি। প্রিয় মোহাম্মদ নাসিম পরপারে চলে যাওয়ায় জনাব আমির হোসেন আমুকে ১৪ দলের সমন্বয়কের দায়িত্ব দেওয়া যদি রাজনীতির সুবাতাস বয়ে আনে তাহলে সত্যিই সেটা এ করোনার দুর্যোগ-দুর্বিপাকেও এক আনন্দের খবর হবে।

বাংলাদেশের প্রথম বিসিএসে কাদেরিয়া বাহিনীর বেশ কয়েকজন অংশগ্রহণ করেছিল। ২১-২২ জন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছিল। তার অর্ধেকের বেশি পরীক্ষা দিয়েছিল বাবর রোডের বাড়ি থেকে। কাদেরিয়া বাহিনীতে যারা লেখাপড়া করেছিল বা পরে করেছে তারা অনেকেই ভালো অবস্থানে যেত যদি না হঠাৎ করে বঙ্গবন্ধু মারা যেতেন, ঘাতকের হাতে খুন হতেন। পিতার মৃত্যু সব সন্তানকে এলোমেলো করে দিয়েছিল। বরং একটু পরে যারা কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়েছে তারা ভালো করেছে। কারণ বঙ্গবন্ধুকে হত্যার রেশ তখন অনেকটাই কেটে গিয়েছিল। বীর মুক্তিযোদ্ধা আলম তালুকদারও তেমনই একজন। বিসিএস পাস করে চাকরি করছিল। ’৯০-এ আমি দেশে ফিরলে হঠাৎ একদিন টুঙ্গিপাড়ায় আলমের সঙ্গে দেখা। সে তখন গোপালগঞ্জ সদরের ইউএনও। বিএনপির সরকার। ওর মধ্যেই জোর করে তার বাড়ি নিয়ে যায়। সে যে কি যতœ বলার মতো নয়। আলম তালুকদার এমনিই ছিল স্বভাবকবি, কিছুটা ভাবুক স্বভাবের। আমাকে ভালোবাসত, মান্য করত পিতার মতো। অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি হয়ে অবসরে গিয়েছিল। অবসর সময়ও যোগাযোগ হতো, দেখা-সাক্ষাৎ হতো। বছরখানেক আগে মিরপুর ১ নম্বরে এক বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে গিয়েছিলাম সেখানে উপদেষ্টা হিসেবে কাজ করত। নিয়ে গিয়েছিল ভাইস চ্যান্সেলর, চেয়ারম্যান এবং কমিটির সদস্যদের কাছে। সেখানে তার সম্মান দেখে অভিভূত হয়েছিলাম। স্বভাবকবি, ছড়াকার, লেখক- সব সময়ই কমবেশি লিখত। যা দেখত তাই লিখত। বছর কয়েক আগে ওর বই উল্টে দেখি লেখক পরিচিতির শেষের দিকে, ‘শিথিল মনির নানা তা না না না।’ সঙ্গে সঙ্গে ওকে ফোন করেছিলাম, তুমি এটা কী লিখেছ? বলেছিল, নাতিনের নাম মনে এলো তাই লিখেছিলাম। আমার বড় ভালো লেগেছিল। মনে হয় ১০ দিনও হবে না, চ্যানেল আইয়ের সকালের দৈনিক পত্রিকা নিয়ে এক অনুষ্ঠানে দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে ওর এক ছড়া শুনেছিলাম। তিন-চার দিন পর হঠাৎ সে অনুষ্ঠানেই শুনলাম আলম তালুকদার মারা গেছে। ভাবতে পারিনি। মৃত্যুকে সহজভাবে নিতে শিখেছি অনেক আগে। ’৭১ এ স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় ৩০-৪০ জন বীর যোদ্ধা আমার সামনে শেষনিঃশ্বাস ত্যাগ করেছে, ’৭৫-এ বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদের সময়ও ২০-২৫ জন আমার সামনে ইহলোক ত্যাগ করেছে। বাবা-মা-চাচা-খালা-ফুপু তেমন কেউ নেই। তাই মৃত্যু এখন আর তেমন আকুল করে না। তবু বুকে আঘাত লাগে, বোঁটা ছেঁড়া টান অনুভব করি। তেমনি আলম তালুকদারের হঠাৎ মৃত্যুসংবাদ আমাকে সত্যিই কিছুটা এলোমেলো করে দিয়েছে। অন্যদিকে সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন চলে গেলেন। তাঁর জন্য কষ্ট লেগেছে, কিন্তু আলমের মতো নয়। আলম তালুকদার সাহারা খাতুনের চাইতে ১২-১৩ বছরের ছোট। আর সে যে অসুস্থ তাও জানতাম না। কিন্তু সাহারা খাতুন বেশ কিছুদিন অসুস্থ ছিলেন। মাঝেমধ্যেই খবর পেতাম। একেওকে জিজ্ঞাসাও করতাম। তাই অতটা বুকে লাগেনি। আমরা সবাই চলে যাব। সাহারা খাতুনকে নিয়ে সে রকমই বুক বেঁধে ছিলাম। কিন্তু আলম তালুকদারকে নিয়ে তেমনটা নয়। সাহারা খাতুন আগাগোড়া মাঠের কর্মী। স্বাধীনতাযুদ্ধে বেশ নাম হওয়ায় অনেকেই ছুটে আসতেন। সাহারা খাতুনের সঙ্গে সেভাবেই পরিচয় হয়েছিল। বঙ্গবন্ধু নিহত হওয়ার পর নির্বাসিত জীবনে আমি যখন বর্ধমানে সেখানেও তিনি গিয়েছিলেন। কয়েকদিন ছিলেন। আমার মাকে তাঁর দারুণ পছন্দ হয়েছিল। আমার মা পছন্দ হওয়ার মতো মানুষও ছিলেন। ’৯০-এ দেশে ফিরে সাহারা খাতুনকে অনেক দেখেছি। তাঁর ডাকে মিটিংয়ে গেছি। একজন খাঁটি বঙ্গবন্ধুপ্রেমী রাজনৈতিক মানুষ। তাঁর জীবনের শ্রেষ্ঠ সাহসী ভূমিকা হয়ে থাকবে বিডিআর বিদ্রোহে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী হিসেবে পিলখানায় যাওয়া এবং বিডিআরদের অস্ত্র নেওয়া। সে সময় রাজনৈতিক ব্যক্তি হিসেবে জামালপুরের মির্জা আজম ও জাহাঙ্গীর কবির নানক এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন- এ তিন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের বিডিআর বিদ্রোহ নিয়ন্ত্রণে প্রত্যক্ষ ভূমিকা ইতিহাসের পাতায় ব্যাপক গুরুত্বের সঙ্গে স্থান পাবে। সে সময় আরও একজন মহিলা এমপি নিজস্ব উদ্যোগে গিয়েছিলেন। বড় ভালো লেগেছিল তাঁর কথা শুনে। তিনি বলেছিলেন, ‘আমি মায়ের জাতি। আমাকে দেখে যদি তাদের উত্তেজনা কমে সেজন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েও এসেছি।’ আমি ভীষণ মুগ্ধ হয়েছিলাম। তিনি বাংলাদেশের এক অনন্য ইতিহাস, প্রথম মহিলা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী। বাংলাদেশ তাঁকে বহুদিন মনে রাখবে। সাহারা খাতুনের বিদেহী আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি। আল্লাহ যেন তাঁকে বেহেশতবাসী করেন। সূত্র: বাংলাদেশ প্রতিদিন

লেখক : রাজনীতিক বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী বীরউত্তম

googel
বিজ্ঞাপন