পাস হলো বাজেট

করোনা পরিস্থিতি মোকাবিলা করে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও জীবন-জীবিকা রক্ষাকে প্রাধান্য দিয়ে জাতীয় সংসদে আগামী ২০২০-২১ অর্থবছরের ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার মেগাবাজেট পাস করা হয়েছে। এবারের বাজেটের স্লোগান ছিল ‘অর্থনৈতিক উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ পথ পরিক্রমা’। এটি অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের দ্বিতীয় বাজেট। আর বর্তমান আওয়ামীলীগ সরকারের টানা ১২তম।

জাতীয় সংসদে স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর সভাপতিত্বে মঙ্গলবার সংসদ অধিবেশন শুরু হয় বেলা ১১টায়। এরপর বাজেটের ওপর আলোনায় বিরোধী দলীয় এমপিরা ৪২২টি ছাঁটাই প্রস্তাব এবং ৫৯টি দাবি উত্থাপন করেন। ২টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের মঞ্জুরি দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাবের উপর আলোচানা হয়। পরে ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো কণ্ঠভোটে নাকচ হয়ে যায়। এরপর দুপুরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপস্থিতিতে বাজেট পাস করার জন্য অর্থমন্ত্রী তা উপস্থাপন করেন। পরে সংসদে কণ্ঠভোটে বাজেট পাস করা হয়। এ সময় সরকার দলীয় এমপিরা টেবিল চাপড়ে অর্থমন্ত্রীকে সমর্থন ও স্বাগত জানান। ১ জুলাই থেকে নতুন এ বাজেট কার্যকর হবে।

পাস হওয়া ২০২০-২১ অর্থবছরের জন্য সংযুক্ত তহবিল থেকে ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৬৪২ কোটি ৪৪ লাখ ২১ হাজার টাকার নির্দিষ্টকরণ বিল পাস করা হয়। স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী অধিবেশনের শুরুতেই মঞ্জুরি দাবিতে আলোচনা করার কথা জানান। সরকার, বিরোধী দল ও স্বতন্ত্র এমপিরা এসব দাবিতে আলোচনা করেন।

এবারের বাজেটে সরকার মোট ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে। চলতি বাজেটে যা ছিল ৫ লাখ ২৩ হাজার ১৯০ কোটি টাকা। বাজেটে পরিচালনসহ অন্যান্য ব্যয়বাবদ খরচ ধরা হয়েছে ৩ লাখ ৬২ হাজার ৮৫৫ কোটি টাকা। এর মধ্যে বেতন-ভাতাবাবদ ব্যয় রাখা হয়েছে ৬৫ হাজার কোটি টাকা। সরবরাহ ও সেবাবাবদ ব্যয়ে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৫ হাজার কোটি টাকা। ঋণের সুদ পরিশোধ বাবদ রাখা হয়েছে ৬৩ হাজার ৫২৫ কোটি টাকা। সরকারি প্রণোদনা, ভর্তুকি ও অনুদানবাবদ বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১ লাখ ৩৪ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে বরাদ্দ থাকছে ২ লাখ পাঁচ হাজার ১৪৫ কোটি টাকা। বাজেটে সরকারের মোট রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৩ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) লক্ষ্যমাত্রা হচ্ছে ৩ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকা। এনবিআরবহির্ভূত অন্যান্য ক্ষেত্র থেকে আসবে ৪৮ হাজার কোটি টাকা।

গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল ২০২০-২১ অর্থবছরের ৫ লাখ ৬৮ হাজার কোটি টাকার বাজেট পেশ করেন। এবার করোনা সংকটের কারণে বাংলাদেশের সংসদের ইতিহাসের সবচেয়ে কম সময়ে বাজেট পাস করা হলো। মাত্র দুই দিন বাজেটের ওপর কয়েক ঘণ্টা আলোচনা শেষে এই বাজেট পাস হয়। এর আগে সাধারণত ৪০ ঘণ্টার অধিক আলোচনা করে বাজেট পাস করা হলেও এবার করোনা মহামারির কারণে সীমিত আকারে সংসদ অধিবেশন চলে। বিরতি দিয়ে দিয়ে অধিবেশন চলতে থাকায়। গত ১০ জুন অধিবেশন শুরু হলেও ৩০ জুন পর্যন্ত মাত্র ৭ কার্যদিবস সংসদ চলে। এরমধ্যে ১৫ জুন সম্পূরক বাজেট পাস হয়। আর ২৯ জুন অর্থবিল-২০২০ পাস করা হয়। এরপর সংসদের বৈঠক আগামী ৮ জুলাই পর্যন্ত মুলতবি ঘোষণা করা হয়। ওই দিন সংসদ চলার পর ৮ম অধিবেশন তথা বাজেট অধিবেশনের সমাপ্তি ঘটতে পারে।

নির্দিষ্টকরণ বিল পাস আগামী অর্থবছরের বাজেট ব্যয়ের বাইরে সরকারের বিভিন্ন ধরনের সংযুক্ত দায় মিলিয়ে মোট ৭ লাখ ৫৯ হাজার ৬৪২ কোটি ৪৪ লাখ ২১ হাজার টাকার নির্দিষ্টকরণ বিল জাতীয় সংসদে কণ্ঠভোটে পাস হয়েছে। এর মধ্যে এমপিদের ভোটে গৃহীত অর্থের পরিমাণ ৫ লাখ ২৩ হাজার ৪৪৪ কোটি ২৪ লাখ ৭ হাজার টাকা এবং সংযুক্ত তহবিলের ওপর দায় ২ লাখ ৩৬ হাজার ১৯৮ কোটি ২০ লাখ ১৪ হাজার টাকা। সংযুক্ত তহবিলের দায়ের মধ্যে ট্রেজারি বিলের দায় পরিশোধ, হাইকোর্টের বিচারপতি ও মহাহিসাব নিরীক্ষক ও নিয়ন্ত্রকের বেতনও অন্তর্ভুক্ত।

মঞ্জুরি দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাব আগামী অর্থবছরের বাজেটের ওপর সংসদে উত্থাপিত বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ খাতের ৫৯টি মঞ্জুরি দাবির বিপরীতে বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির এমপিরা ৪২২টি বিভিন্ন ধরনের ছাঁটাই প্রস্তাব আনেন। এর মধ্যে আইন মন্ত্রণালয় ও স্বাস্থ্য সেবা বিভাগের দাবি ও ছাঁটাই প্রস্তাব নিয়ে আলোচনা হয়। বিরোধী দলের আলোচনার পর সবগুলো প্রস্তাব কণ্ঠভোটে বাতিল হয়ে যায়। ছাঁটাই প্রস্তাবগুলো এনেছিলেন জাতীয় পার্টির কাজী ফিরোজ রশীদ, মুজিবল হক চুন্নু, ফখরুল ইমাম, পীর ফজলুর রহমান, শামীম হায়দার পাটোয়ারী, লিয়াকত হোসেন খোকা, রওশন আরা মান্নান, বিএনপির হারুনুর রশীদ এবং রুমিন ফারহানা। দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর অনুপস্থিতিতে তাদের পক্ষে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, দুর্নীতি দমন কমিশন সংক্রান্ত মঞ্জুরি দাবি সংসদে তোলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

বাজেটে খাতওয়ারি বরাদ্দ বাজেটে বরাবরের মতোই সর্বোচ্চ বরাদ্দ পদয়া হয়েছে জনৎুশাসন খাতে। এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে এক লাখ ৮০ হাজার ৭৫০ কোটি টাকা। একক খাত হিসেবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বরাদ্দ পেয়েছে পরিবহন ও যোগাযোগ। এ খাতে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৬৪ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা। এরপর শিক্ষা ও প্রযুক্তি খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ৮৫ হাজার ৭৬০ কোটি টাকা। স্থানীয় সরকার ও পল্লী উন্নয়ন খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৩৯ হাজার ৫৩৭ কোটি টাকা। ৩৪ হাজার ৮৮২ কোটি বরাদ্দ পেয়েছে প্রতিরক্ষা খাত। জনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ করা হয়েছে ২৮ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা। করোনা পরিস্থিতির কারণে এবার স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে আগের যে কোনো বছরের তুলনায়। বাজেটে এ খাতে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ২৯ হাজার ২৪৬ কোটি টাকা। সামাজিক নিরাপত্তা ও কল্যাণে বরাদ্দ দেয়া হয়েছে ৩২ হাজার ১৬৬ কোটি টাকা। এছাড়া গৃহায়ণে ৬ হাজার ৯৩৬ কোটি টাকা, বিনোদন, সংস্কৃতি ও ধর্মে ৪ হাজার কোটি ৭৮৬ টাকা, বিদ্যুৎ ও জ্বালানীতে ২৬ হাজার ৭৫৮ কোটি টাকা, কৃষিতে ২৯ হাজার ৯৮৩ কোটি টাকা, শিল্প ও অর্থনৈতিক সার্ভিসে ৩ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে।