শুধু করোনায় নয়; প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষা সব সময়ের জন্যই লাভবান

সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন: ফাইল ছবি

নিউজ ডেস্ক,

করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারনে টেলিভিশন ও অনলাইনে চলছে শিক্ষা-কার্যক্রম। তবে দেশে স্থায়ীভাবে প্রযুক্তিনির্ভর এ শিক্ষাব্যবস্থা চালুর পরামর্শ দিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক সফল শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী আ ন ম এহসানুল হক মিলন। দেশজনতা ডটকমকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে এ কথা বলেন তিনি।

এহসানুল হক মিলন বলেন, অনলাইনে শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা করা হলে ঢাকার সেরা স্কুলগুলো যে শিক্ষা পাবে প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলের শিক্ষার্থীরাও সেই একই শিক্ষা পাবে। এতে সরকারের বই ছাপানোর টাকাও বেচে যাবে। আর কয়েক বছরের বই ছাপানোর টাকা দিয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে ট্যাব (ইলেকট্রিক বই) তুলে দেয়া সম্ভব বলে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়াও সাক্ষাতকারে করোনায় শিক্ষাব্যবস্থা ওপর বিরুপ প্রভাব ও উত্তরনের উপায় নিয়ে কথা বলেন তিনি। সাক্ষাতকার নিয়েছেন মোঃ ইয়াকুব আলী।

দেশজনতা ডটকম: লকডাউন কি শিক্ষাব্যাবস্থার উপর কতটা বিরূপ প্রভাব ফেলবে ?

এহসানুল হক মিলন: লকডাউন শিক্ষাব্যাবস্থার উপর বিরূপ প্রভাব ফেলবে এটা ঠিক তবে সেটা খুবই সাময়িক। আমরা ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধে ৯ মাস লেখাপড়া করিনি তাতে আমাদের শিক্ষাজীবন শেষ হয়ে যায়নি। সে সময় গোলাগুলির ভয়ে বিশেষ করে শহর অঞ্চলে মানুষ ঘর থেকে বের হতে পারেনি। সে সময় হত্যাকারীরা প্রকাশ্যে আসতো, এখনকার হত্যাকারী অদৃশ্য। ১৯৭১ সালের দিকে আমরা প্রযুক্তিতে অনেক পিছিয়ে ছিলাম। সে সময় শুধু মাত্র ছাপার অক্ষরে লেখা বই ছাড়া পড়ার আর কিছুই ছিল না। যে যেভাবে পেরেছে পড়ার অভ্যাস বজায় রেখেছে। যে পারিনি সে চুপচাপ ঘরে বসে ছিল।
এখন প্রযুক্তির উৎকর্ষ সাধনে আমরা হাতের কাছে সবই পাচ্ছি। টিভির রিমোট থেকে স্মার্ট ফোন সবই সচল আছে। যেটা ভালো লাগছে সেটা উপভোগ করছি। মনোযোগী শিক্ষার্থীরা এই সময়ে অনেক গুণী শিক্ষকদের লেকচার ফলো করছে। কেউ কেউ গুগল থেকে ভালো ভালো গল্প ,প্রবন্ধ ,নাটক নামিয়ে দেখতে পারে। বিনোদনের মাধ্যমে বিদ্যা অর্জনের সব পথ খোলা আছে তথ্যপ্রযুক্তিতে। শিক্ষার্থীদের এই প্রযুক্তির সর্বোচ্চ ব্যবহার করে জ্ঞান আহরণ করতে হবে। সময়কে যথাযথ ভাবে কাজে লাগাতে হবে। তাহলে শিক্ষা ব্যবস্থার উপর যে বিরূপ প্রভাব পড়ার কথা তা অনেক অংশে কাটিয়ে ওঠা সম্ভব।

দেশজনতা ডটকম.করোনার মধ্যে টেলিভিশন এবং অনলাইনে যে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে তা কি যথেষ্ট?

এহসানুল হক মিলন: করোনার মধ্যে টিভি, অনলাইনে যেভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে সেটা আসলে যথেষ্ট নয়। আমাদের দেখতে হবে সরকারি ভাবে বিটিভিতে যেভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে সেটা সম্পূর্ণ একমুখী। সেখানে শিক্ষার্থীর কোনো অংশ গ্রহণ নেই। নেই কোনো প্রশ্নোত্তর পর্ব। এখন যে পদ্ধতিতে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে তা একেবারেই সেকেলে। সত্তর দশকে কিংবা আশির দশকে যেভাবে শিক্ষা দেয়া হতো এখনো সেভাবে দেওয়া হচ্ছে। টিভি, অনলাইনে পাঠদানের সময় অনেক শিক্ষকরা মাঝে মধ্যে ভুল করছেন, কিন্তু সেটা সংশোধনের কোনো পথ খোলা রাখা হয়নি।

অর্থাৎ করোনা পরিস্থতিতে একটি অপরিকল্পিত শিক্ষা কার্যক্রম চলছে। বর্তমানে অনলাইনে সব কিছু চলছে। সঠিক পরিকল্পনা করে এর মাধ্যমে আরো ভালোভাবে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা যেতো। শিক্ষার্থীদের মাঝে যে বিনা মূল্যে বই বিতরণ করা হয়েছে তার সবই সংরক্ষিত আছে কম্পিউটারে। সরকার চাইলে এই করোনাকালে বাংলাদেশ টেক্সট বুক বোর্ডের (এনসিটিবি) আইটি সেকশন কাজে লাগিয়ে সব বইকে ইলেক্ট্রোনিক (ই-বুক) বইতে রূপান্তরিত করতে’পারতেন। এই সময়ের মধ্যে বিশেষজ্ঞ শিক্ষক অথবা সেলিব্রিটি অভিনেতা-অভিনেত্রী যারা শিক্ষার্থীদের কাছে খুবই প্রিয় তাদের মাধমে ভিডিও রেকর্ডিং করে ইউটিউবে ছেড়ে দিতে পারতেন। তাহলে শিক্ষার্থীরা সেখানে ঢুকে পাঠ গ্রহণ করতে পারতো, কিছু জানার প্রয়োজন হলে মন্তব্যের ঘরে লিখতে পারতো। তাহলে শিক্ষার আদান-প্রদান ঘটতো। এটা আমি বলছি স্বল্প মেয়াদী পরিকল্পনার কথা।

দেশজনতা ডটকম: করোনা নিয়ে দেশবাসী ও শিক্ষার্থীদের প্রতি আপনার কোনো আহ্বান আছে কি ?

এহসানুল হক মিলন : অবশ্যই আছে, প্রথম কথা হলো লকডাউন ও করোনা ভাইরাস দুটো পরিপূরক শব্দ। কেউ বলতে পারছেন না এ ভাইরাস এর দাপট কত দিন চলবে। ইতিমধ্যেই ৫ মাস চলে গেছে এখনো পর্যন্ত এর কোনো কার্যকর ওষুধ কিংবা টিকা আবিষ্কার সম্ভব হয় নাই। যে সব চিকিৎসা চলছে তা ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ সঠিক বলে মনে হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে কমপক্ষে ৩ বছর আমাদের এই করোনা ভাইরাস এর সাথে বসবাস করতে হবে। আর ভিন্ন ভিন্ন দেশের বিজ্ঞানীরা বলছেন তারা ভ্যাকসিন আবিষ্ককারের দোর গোড়ায় পৌঁছে গেছেন। চীন বলছে চলতি বছরের ডিসেম্বর অথবা আগামী ২০২১ সালের ১ম দিকেই তারা কার্যকর ভ্যাকসিন বাজারে আনতে পারবেন। তাদের ভ্যাকসিন মানবদেহে ১ম দফায় ট্রায়াল হয়ে গেছে। ২য় দফা জুনে সম্পন্ন করতে চায়। যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপ এর বিজ্ঞনীরাও আশার বাণী শুনিয়েছেন। তবে সবই দীর্ঘ মেয়াদি পরিকল্পনা। এই দীর্ঘ মেয়াদে কর্মজীবি মানুষ কিংবা শিক্ষার্থীদের ঘরে আবদ্ধ করে রাখা সম্ভব নয়। এজন্য দেশবাসির কাছে আমার আহবান থাকবে নিজের জীবন আগে। নিজে বাঁচলে জীবিকা অর্জন সম্ভব। অতএব নিজের সুরক্ষার জন্য এখনো পর্যন্ত হূ এবং জন হপকিংস বিশ্ব বিদ্যালয়ের পরামর্শ অনুযায়ী ঃ

১. ঘর থেকে বের হলে অবশ্যই অবশ্যই মাস্ক পরতে হবে। কারণ করোনা ভাইরাসের একমাত্র প্রবেশ পথ নাক। নাকের সুরক্ষা দিতে হবে সবার আগে।
২. গ্লাভস পরতে হবে। যাতে কোথাও যেমন বাসের হাতল , বাসের সিট, লিফটের বাটনে সরাসরি হাত না লাগে সেটা খেয়াল রাখতে হবে। যেকোন সাবান দিয়ে কমপক্ষে ২০ সেকেন্ড হাত ধুতে হবে বারবার।
৩.সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে চলতে হবে। ভিড় এড়িয়ে চলতে হবে।

৪. দেশের চিকিৎসা ব্যবস্থার নাজুক অবস্থার কথা প্রতিদিন খবরের কাগজে দেখতে পাচ্ছি। উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারাও হাসপাতালে ঘুরে ঘুরে বিনা চিকিৎসায় মারা যাচ্ছেন। তাই সবার কাছে অনুরোধ থাকবে ; কোভিড-১৯ এর লক্ষন দেখা দিলেই দিনে অন্ততঃ ৪ থেকে ৫ বার গরম পানির ভাপ নিতে হবে এবং আদা , দারুচিনি , গোলমরিচ দিয়ে গরমপানির সঙ্গে গ্রিনটি ৪/৫ বার খেতে হবে। শরীরে ভিটামিন সি এবং ডি বাড়াতে হবে। তাহলে করোনা প্রতিরোধ বাড়বে। বাচঁতে হলে এগুলো করতে হবে।

শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান :

১.দীর্ঘ দিন ঘরে বসে থাকতে থাকতে চঞ্চল মতি শিক্ষার্থীরা মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছে এটা ঠিক।তবে সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। সারাক্ষন বিছানায় শুয়ে বসে কাটালে চলবে না। ঘরের মধ্যেই পায়চারি করতে হবে। যে বই গুলো পড়লে ভালো লাগবে সে বই গুলো পড়ে অভ্যাস বজায় রাখতে হবে। পড়তে ভালো না লাগলে টেলিভিশন দেখতে হবে। এর বাইরে সব চেয়ে জরুরি ঘরে স্মার্ট ফোন থাকলে ইউটিউবে ঢুকে বিষয় ভিত্তিক লেকচার অথবা আনন্দদায়ক প্রোগ্রাম দেখে সময় কাটানো যেতে পারে।

২. কোনো অবস্থাতেই ঘর থেকে বের হওয়া যাবে না। কোন ব্যক্তি কোভিড -১৯ নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে আমরা কেউ তা জানি না।

বন্ধু-বান্ধব অনেক সময় বলতে চায় না অথচ তাদের সংস্পর্শে গেলেই আক্রান্ত হওয়ার সম্ভবনা শতভাগ। অতএব ঘরে থাকা মানে ৮০ ভাগ নিরাপদে থাকা। যতদিন স্কুল কলেজ খুলছে না ততদিন ধৈর্যধারণ করতে হবে। বেঁচে থাকলে লেখা পড়া করার জন্য অনেক সুযোগ পাওয়া যাবে।

দেশজনতা ডটকম: করোনা পরিস্থিতিতে ভবিষ্যত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনায় সরকারের প্রতি আপনার কোন পরামর্শ ও সুপারিশ আছে কি ?

শিক্ষা কার্যক্রম নিয়ে দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা দরকার। সারা বিশ্বে শিক্ষা নিয়ে ব্যপক গবেষণা চলছে। কিভাবে শিক্ষার্থীর কাছে সহজে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া যায় তার প্রতিযোগিতা চলছে।যে কারণে অনলাইন শিক্ষা কার্যক্রম জনপ্রিয় হয়ে উঠছে। এরমধ্যেই এলো করোনাভাইরাসের ভয়াল থাবা। আমি মনে করি করোনা আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমে পরিবর্তন আনার ক্ষেত্রে অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। শুধু মাত্র করোনার কথা মাথায় রেখে নয় স্বাভাবিক সময়ের জন্য আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে হবে। শিক্ষার্থীরা যাতে ঘরে বসে ক্লাসরুমের মতো অধ্যায়ন করতে পারে তার ব্যবস্থা করতে হবে। আর এমন ব্যবস্থা চালু করতে পারলে সরকার আর্থিক ভাবে অনেক লাভবান হবে এবং শিক্ষার্থীরা লেখাপড়ায় অধিক মনোযোগী হবে।

এ জন্য সরকারকে কাগজে মুদ্রিত বই এর পরিবর্তে ইলেকট্রিক বই অর্থাৎ ট্যাব এ চলে যেতে হবে। সরকার প্রতিবছর বই এর জন্য ১১শ কোটি টাকা খরচ করে যা কিনা পরের বছর কোনো কাজে লাগেনা। ২ থেকে ৩ বছর এই বই ছাপার টাকা দিয়ে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর হাতে একটি করে ট্যাব তুলে দেওয়া সম্ভব। বই ভর্তি ব্যাগ এর পরিবর্তে একটা ট্যাব নিয়ে স্কুলে যাওয়া সহজ।
শিক্ষার্থীদের হাতে ট্যাব তুলে দেয়ার সাথে সাথে মাউশির কাজ হবে দক্ষ শিক্ষক দিয়ে বিষয়ভিত্তিক আলোচনা নিয়ে ইউটিউব চ্যানেল তৈরী করবেন।

বিশেষজ্ঞ বোর্ডের মাধ্যমে প্রতিটি লেকচার অনুমোদিত হতে হবে। পুরো বিষয়টি তদারক করবে মাউশি যাতে সব শিক্ষার্থী একই সময়ে সমভাবে গ্রহণ করতে পারে। প্রতিটি লেকচারের নিচে লেখা থাকবে মাউশি অনুমোদিত এবং সরকারের মনোগ্রাম থাকবে।যাতে কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নকল করতে না পারে।তাহলে নোট বইয়ের ব্যবসা চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে।

প্রত্যেক স্কুল এর প্রধান শিক্ষক তাদের ট্যাবে অথবা কম্পিউটারে এসব বক্তব্য ডাউনলোড করবেন এবং শিক্ষকদের হাতে তুলে দেবেন। শিক্ষকরা শ্রেনি কক্ষে যেয়ে শিক্ষার্থীদের সামনে প্রতিদিন ধারাবাহিক ভাবে এ সব বক্তব্য উপস্থাপন করবেন। তাহলে দেখা যাবে ঢাকার সেরা স্কুল গুলো যে শিক্ষা নিচ্ছে প্রত্যন্ত গ্রামের স্কুলের একজন শিক্ষার্থীও সেই একই শিক্ষা নিতে পারছে। আর এ ব্যবস্থা চালু হলে শিক্ষার্থীদের পায়ে হেটে স্কুলেও যেতে হবে না। স্কুল ভবন নির্মাণ নিয়ে সরকারকে মাথাও ঘামাতে হবে না।

এটা অবশ্যই বিশাল আলোচনার বিষয়। তাই ছোটোখাটো সাক্ষাৎকারে তুলে ধরা সম্ভব নয়। আমার সংস্থা এডুকেশন রিফর্ম ইনিসিয়েটিভ (ই আর আই ) এ ব্যাপারে গবেষণা পত্র তৈরির কাজ করে যাচ্ছে। লকডাউন উঠে গেলে সেমিনার সিম্পোজিয়ামের এর মাধ্যমে আমি সেগুলো তুলে ধরবো। সরকার প্রয়োজন মনে করলে আমার সুপারিশ গ্রহণ করতে পারেন অথবা সমালোচনাও করতে পারেন। তবে আমার বিশ্বাস শিক্ষায় সমতা আনার ক্ষেত্রে চলমান প্রযুক্তি কাজে লাগাতে পারলে অনেক উপকার হবে।

ইতোমধ্যে শিক্ষায় আমাদের দেশসহ বিশ্বময় ডিজিটাল পদ্ধতি চালু হয়ে গেছে। অনেক নামি-দামি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান অনলাইনের মাধ্যমে পাঠদান করে চলেছে। বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদের শিক্ষা কার্যক্রমে অনলাইন চালু করতে হবে।এটা এতদিন যদিও ধীরগতিতে চলছিল, এই করোনা ভাইরাস সেই গতি বেগবান করতে কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

সাবেক শিক্ষা প্রতিমন্ত্রী এহসানুল হক মিলন: ফাইল ছবি