আয়েশা সিদ্দিকা রা.: মজলুম এক উম্মুল মুমেনীন

ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী
ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী ফাইল ছবি

ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী

আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা উম্মুল মুমেনীনগণের মধ্যে ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ। তবে মজলুম। একদিকে শিয়াদের যত ক্ষোভ এবং রাগ তাঁর উপর, অন্যদিকে নব্য সালাফীপন্থিদের পক্ষ থেকে তাঁর পূতঃপবিত্র চরিত্রের উপর মিথ্যা অপবাদ। আরেকটি পক্ষ থেকেও উনি যুলুমের শিকার। সে পক্ষটি আর কেউ নয়, সুন্নিবেশী খারেজিমনা-নাসেবীবান্ধব কিছু উজবুক। মামুর অতিভক্তির কারণে মামুকে নির্দোষ প্রমাণ করতে গিয়ে এ দলটি আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকার বিরুদ্ধে অভিযোগ করে থাকে যে তিনি মওলা আলীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তারা জঙ্গে জামাল আর জঙ্গে সিফফিনকে এক করে উভয়কে দোষী বা নির্দোষ বানানোর অপচেষ্টা করে থাকে। জঙ্গে জামাল এবং জঙ্গে সিফফিন যে আলাদা দুটো যুদ্ধ এবং আলাদা প্রেক্ষাপটে সেগুলো সংঘটিত হয়েছিল তা আমি অন্য একটি পোষ্টে আলোচনা করেছি।

শিয়ারা আম্মাজানের বিরুদ্ধে ক্ষোভে ফেটে পড়ে কেন জানেন? গাদিরে খুমের ঘোষণা, “আমি যার মওলা, এই আলীও তার মওলা” দ্বারা এরা খলিফা বুঝে থাকে। ফলে এরা মনে করে আম্মাজান আয়েশা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা তাঁর নিজ পিতা আবু বকর রাদ্বিয়াল্লাহু আনহুর খলিফা হবার পথ তৈরি করে দিয়েছিলেন। এটা শিয়াদের ভ্রান্ত ধারণা গুলোর মধ্যে একটি এবং এটি একটি মিথ্যা অপবাদ। গাদিরে খুমের প্রেক্ষাপটে “মওলা” অর্থ যেমন খলিফা নয়, “মওলা” অর্থ তেমন বন্ধুও নয়। এখানে মওলা বলতে “অভিভাবক” বোঝানো হয়েছে। কেননা, নবীজি ﷺ না খলিফা ছিলেন আর না তিনি সাহাবাগণের বন্ধু ছিলেন। নাসেবীরাও এই গাদিরে খুমের ঘোষণাকে শিয়াদের বানানো বলে বই লিখেছে। অথচ এই ঘোষণা মুতাওয়াতির হাদিস দ্বারা প্রমাণিত একটি ঘটনা। মানে অসংখ্য বর্ণনাকারী এই একই হাদিস বর্ণনা করেছেন।

শিয়ারা যে বিষয়টি ভুলে যায় তা হল, উমাইয়্যা রাজার অন্যায়ের প্রতিবাদ যারা করেছিলেন তাদের মধ্যে আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রা অন্যতম। জলিলুল কদর সাহাবী আদি বিন হুজর রা এবং তাঁর সাথীদের জীবন্ত মাটিতে পুতে হত্যা করা হয়েছিল। তাদের অপরাধ, তারা মসজিদের মিম্বরে মওলা আলী আ. ওয়া রা. এবং আহলে বাইতের সদস্যের প্রতি গালি ও লানতের প্রতিবাদ করেছিলেন। মওলা আলীর প্রতি ভালোবাসার কারণে তাদেরকে শাহাদাতের অমিয় সুধা পান করতে হয়। আম্মাজান আয়েশা রা এই ঘটনার প্রতিবাদ করেছিলেন এবং উমাইয়্যা রাজার কাছে সামনাসামনি এই ঘটনার জন্য কৈফিয়ত তলব করেছিলেন। অনেকে মনে করেন, এই প্রতিবাদের কারণেই তাঁকে প্রাণ দিতে হয়েছিল। মতটি তত শক্তিশালী না হলেও এ কথা সুন্নি ইমাম, মুহাদ্দিস, মুফাসসির এবং ইতিহাসিকগণ আলোচনা করেছেন যে, উমাইয়্যা রাজার নির্দেশে কুখ্যাত মারওয়ান (মদিনা থেকে বহিষ্কৃত সাহাবী) এই হত্যাকাণ্ডের জন্য দায়ী। আল্লাহ্‌ পাকই ভালো জানেন। তবে মশহুর মত হল উনি ৫৮ হিজরীর রমজানের ১৭ তারিখে স্বাভাবিক ভাবেই মৃত্যুবরণ করেন।

মদিনার কিছু মুনাফিক তাঁর চরিত্রে কালিমা লেপনের চেষ্টা করেছিল। একমাস ব্যাপী তিনি পিতা আবু বকর রা এর কাছে ছিলেন। একমাস পর আল্লাহ্‌ পাক তাঁর চরিত্রের পূতঃপবিত্রতা ঘোষণা করে আয়াত নাযিল করলে এর সমাধান হয় এবং কিয়ামত পর্যন্ত এই পবিত্রতার আলোচনা কুরআনের মাধ্যমে লিপবদ্ধ করে দেয়া হয়। অথচ নব্য সালাফী আলবানি কিছুদিন আগেও তার একটি লেখায় আম্মাজানের চরিত্র নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল।

যাঁর মাধ্যমে আমরা রাসূল ﷺ এঁর ব্যক্তিগত এবং পারিবারিক জীবনের খুঁটিনাটি বিষয়গুলো জানতে পারি, তিনি হলেন আম্মাজান আয়েশা সিদ্দিকা রাদ্বিয়াল্লাহু আনহা। নারীদের মধ্যে তিনিই সবচেয়ে বেশি হাদিস বর্ণনা করেছেন। তাঁর বর্ণিত হাদিসগুলো কিয়ামত পর্যন্ত মুসলমানদের পারিবারিক অনেক জটিল সমস্যার সমাধান দিতে সহায়ক হয়েছে। আল্লাহ্‌ পাক এই মজলুম অথচ অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদী কণ্ঠ উম্মুল মুমেনীনকে জান্নাতে উচ্চ মর্যাদায় আসীন করুন। আমীন।