বদর যুদ্ধঃ আল্লাহর অনুগ্রহ এবং রাসুল ﷺ -এঁর ইলমে গায়েবের বহিঃপ্রকাশ

ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী
ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী ফাইল ছবি

ইসলামের ইতিহাসে বদর যুদ্ধের গুরুত্ব অপরিসীম। কাফেরদের বিরুদ্ধে এটাই ছিল সর্বপ্রথম সশস্ত্র যুদ্ধ। এ যুদ্ধে হেরে গেলে হয়তো শিশু ইসলাম চিরতরে পৃথিবীর বুক থেকে বিদায় নিতো। তাই তো রাসুল্লুল্লাহ ﷺ আল্লাহ পাকের দরবারে সেজদায় পড়ে কায়মোনাবাক্যে কাঁদতে কাঁদতে ফরিয়াদ করেনঃ
“হে আল্লাহ! আমার এই অল্প সংখ্যক সাহাবী যদি শহীদ হয়ে যায়- তবে তোমার নাম কে নেবে? আমি তোমার নামের উছিলা ধরে সাহায্য প্রার্থনা করছি।”
আল্লাহ পাক পূর্বেই মুসলমানদের বিজয়ের ব্যাপারে রাসুল ﷺ -কে জানিয়ে দিয়েছিলেন, “দুটি দলের মধ্যে একটিতে তোমাদের বিজয় হবে।” (আনফাল – ৭, প্রথম দলটি আবু সুফিয়ানের এবং দ্বিতীয় দলটি আবু জাহেলের। এ যুদ্ধে কুরাইশদের শোচনীয় পরাজয় হয়। আবু জাহেল, উতবা, ওলীদ, শাইবা, উমাইয়াসহ তাদের ৭০ জন নিহত আর ৭০ জন বন্দী হয়। মুসলমানদের পক্ষে ১৪ জন (৬ মুহাজির এবং ৮ আনসার সাহাবা) শহীদ হওয়ার গৌরব অর্জন করেন।
বদর যুদ্ধের তাৎপর্য
———-
এ যুদ্ধের তাৎপর্য অনেক সুদূরপ্রসারী। এ যুদ্ধের মাধ্যমে আল্লাহ পাক মুসলমানদেরকে ফেরেশতাদের মাধ্যমে গায়েবী সাহায্যের অবতারণা করেন। যারা আল্লাহর রাস্তায় জিহাদ করেন আল্লাহ পাক তাঁদেরকে নিজ জিম্মায় নিয়ে ফেরেশতা পাঠিয়ে সাহায্য করেন। এই যুদ্ধে নবীজী ﷺ -এঁর বেশ কিছু মু’জিজা এবং ইলমে গায়েব প্রকাশ পায়। সর্বোপরি শয়তান যে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু এবং সেও যে আল্লাহর ভয়ে ভীত আল্লাহ পাক তা প্রমাণ করেছেন এ যুদ্ধের মাধ্যমে। কিন্তু তারপরও সে মানুষের অনিষ্ট করতে পিছ পা হয় না। “আর যখন শয়তান সেসব (কাফির)-দের জন্যে তাদের আমলকে সুশোভিত করে দেখালো এবং সে (তাদেরকে) বললো, ‘আজ মানুষের মধ্যে তোমাদের উপর আধিপত্যশীল (হতে পারে এমন) কেউই নেই। আর নিশ্চয়ই আমি তোমাদের আশ্রয়দানকারী (সাহায্যকারী)।’ অতঃপর যখন উভয় সৈন্যবাহিনী একে অপরকে (মুখোমুখি) দেখল তখন সে উল্টো পায়ে পলায়ন করলো আর বলতে লাগলো, ‘নিশ্চয়ই আমি তোমাদের থেকে বিমুখ। অবশ্যই আমি সেসব (কিছু) দেখছি, যা তোমরা দেখছো না। নিশ্চয়ই আমি আল্লাহ্কে ভয় করছি। আর আল্লাহ্ কঠোর শাস্তি প্রদানকারী।’” (সুরা আনফালঃ ৪৮ – ইরফানুল কুরআন)
আল্লাহর অনুগ্রহ
——
আল্লাহ পাক পবিত্র কুরআনের বেশ কিছু সুরায় এই যুদ্ধে কাফেরদের পরাজয় এবং মুসলমানদের বিজয়ের আগাম সংবাদ এবং তাঁর অনুগ্রহ বর্ষণের কথা রাসুল ﷺ -কে জানিয়ে দেন।
“এ দল তো সত্ত্বরই পরাজিত হবে এবং পৃষ্ঠপ্রদর্শন করবে।” (৫৪:৪৫)।
“(হে সম্মানিত হাবীব! আপনি সে গৌরবোজ্জ্বল দৃশ্যও স্মরণ করুন) যখন আপনার প্রতিপালক ফেরেশতাদের বার্তা পাঠালেন, ‘(রাসূলের সাহাবীদের সাহায্যের জন্যে) আমিও তোমাদের সাথে রয়েছি। সুতরাং তোমরা (সুসংবাদ ও সাহায্যের মাধ্যমে) ঈমানদারদের দৃঢ়পদ রাখো। আমি এখনই কাফিরদের অন্তরে (মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহী ওয়া সাল্লামের বাহিনীর) ভয় ও আতঙ্ক ঢেলে দিচ্ছি। সুতরাং তোমরা (কাফিরদের) ঘাড়ে আঘাত করো এবং তাদের সমস্ত হাড়-গোড় ভেঙ্গে চূরমার করে দাও।’” (৮:১১-১২)।
মহানবী ﷺ -এর মু’জিজা

যুদ্ধের শুরুতে মহানবী হযরত মোহাম্মদ ﷺ কুরাইশ বাহিনীর দিকে মুখ করে বললেন, ‘শাহাতিল উজুহ’ অর্থাৎ ওদের চেহারা বিগড়ে যাক। একথা বলেই তিনি কাফির সৈনিকদের প্রতি ধুলোবালি নিক্ষেপ করেন। এ বালি কাফিরদের নাকে মুখে ও চোখে পড়ে। এমনকি ধুলোর কণা ওদের গলায় ডুকে পড়ে। ধুলোর আক্রমণ থেকে কাফির দলের কেউ বাদ যায়নি। তাই আল্লাহপাক বলেন- “(হে মহিমান্বিত হাবীব!) যখন আপনি (তাদের প্রতি নুড়ি পাথর) নিক্ষেপ করেছিলেন, (তা) আপনি নিক্ষেপ করেননি বরং (তা তো) আল্লাহ্ নিক্ষেপ করেছিলেন।” (সূরা : আনফাল, আয়াত : ১৭)।
যুদ্ধের এক পর্যায়ে হযরত ওক্কাশা ইবনে মেহসান আসাদী (রাঃ)-এর তলোয়ার ভেঙে যায়। ওক্কাশা (রাঃ) নবী করীম ﷺ-এর কাছে উপস্থিত হলে তিনি তাকে এক টুকরো শুকনো খেজুরের ডাল দিয়ে বললেন, ওক্কাশা এটি দিয়ে লড়াই করো। ওক্কাশা রাঃ সে ডাল হাতে নিয়ে হেলাতেই তা একটি ধারালো চকচকে তলোয়ারে পরিণত হয়। এরপর তিনি সে তলোয়ার দিয়ে লড়াই করতে লাগলেন। সে তলোয়ারের নাম হয় ‘আওন’ অর্থাৎ সাহায্য। সেটি ওক্কাশার কাছেই ছিল। তিনি বিভিন্ন যুদ্ধে এ তলোয়ার ব্যবহার করতেন। হযরত আবু বকর রঃ’র খেলাফতের সময় ধর্মান্তরিত লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। সে সময়ও এ তলোয়ার তার কাছে ছিল।
এ যুদ্ধে হযরত মুয়ায বিন আমর রাঃ -এর একটি হাত আবু জাহেলের পুত্র ইকরামার তরবারীর আঘাতে দ্বিখণ্ডিত হয়ে যায়। তিনি হাতের খণ্ডিত অংশসহ নবী করীম ﷺ-এর খেদমতে উপস্থিত হলেন। হুজুর পাক ﷺ একটু থু থু মুবারক লাগিয়ে খণ্ডিত অংশ সংযুক্ত করে দিলেন। সাথে সাথে হাত জোড়া লেগে গেল। হযরত মুয়ায রাঃ উক্ত হাত নিয়ে সুস্থ অবস্থায় হযরত উসমান রাঃ এর খেলাফতকাল পর্যন্ত বেচে ছিলেন। সোবহানাআল্লাহ!
মহানবী ﷺ -এর ইলমে গায়েবের প্রকাশ
——————–
“আনাস (রাঃ) থেকে বর্নিত। … সাহাবীগণের সামনে কুরাইশের সাকীগণও উপনীত হল। তাদের মধ্যে বনী হাজ্জাজের একজন কৃষ্ণকায় দাস ছিল। সাহাবীগণ তাকে পাকড়াও করলেন। তারপর তাকে আবূ সুফিয়ান এবং তার সাথীদের সম্পর্কে তাঁরা জিজ্ঞাসাবাদ করলেনঃ তখন সে বলতে লাগলো, আবূ সুফিয়ান সম্পর্কে আমার কোন কিছু জানা নেই। তবে আবূ জাহল, উতবা, শায়বা এবং উমাইয়া ইবনু খালফ – (তারা যুদ্ধের প্রস্তুতি নিচ্ছে) তাদের সম্বন্ধে বলতে পারি। যখন সে এরুপ বললো তখন তাঁরা তাকে প্রহার করতে লাগলেন। এমতাবস্হায় সে বলল, হ্যা, আমি আবূ সুফিয়ান সম্পর্কে খবর দিচ্ছি। তখন তাঁরা তাকে ছেড়ে দিলেন। এরপর যখন তারা পূনরায় আবূ সুফিয়ান সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করলেন, তখন সে বলল, আবূ সুফিয়ান সম্পর্কে আমার কোন কিছু জানা নেই। তবে আবূ জাহল, উতবা, শায়বা এবং উমাইয়া ইবনু খালফ সম্বন্ধে বলতে পারি। যখন সে পূনরায় এ একই কথা বলল, তখন তাঁরা আবার তাকে প্রহার করতে লাগলেন। সে সময় রাসুলুল্লাহ ﷺ নামাজে দন্ডায়মান ছিলেন। অতএব, যখন তিনি এ অবস্হা দেখলেন, তখন সালাত সমাপ্ত করার পর বললেনঃ, সে আল্লাহর শপথ! যার হাতে আমার জান, যখন সে তোমাদের কাছে সত্য কথা বলে তখন তোমরা তাকে মারতে থাক আর যখন সে মিথ্যা বলে তখন তোমরা তাকে ছেড়ে দাও।” [মুসলিম ৪৪৭০]
হাদিসের ব্যাখ্যাকারগণ বলেন, এ বালক সত্য কথাই বলছিল। কিন্তু সাহাবাদের ধারণা ছিল না যে আবু জাহেল এক বিশাল বাহিনী নিয়ে তাঁদের আক্রমণ করতে আসছে। ফলে সে বালকের কথা তাঁরা বিশ্বাস করতে পারছিলেন না। কিন্তু নবী ﷺ ঠিকই জানতে পারলেন যে ওই বালকের কথাই সত্যি, কেননা ইতোমধ্যেই আবু জাহেল মুসলমানদের আক্রমণ করার উদ্দেশ্যে রওয়ানা হয়ে গেছে।
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাঃ থেকে বর্ণিত। “তিনি বলেন, আমরা হযরত ওমর ফারুক রাঃ এর সাথে ছিলাম মক্কা ও মদিনা শরিফের মধ্যখানে। অতঃপর তিনি বদরবাসী সম্পর্কে হাদিস বর্ননা করলেন, তখন তিনি বললেন, রাসুলুল্লাহ ﷺ আমাদেরকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার আগেরদিন নিহত কাফিরদের ধ্বংসের স্থান দেখিয়ে দিলেন। তিনি বলেছিলেন, ইনশাআল্লাহ এটি আগামীকাল অমুকের নিহতের স্থান হবে এবং এটি অমুকের নিহতের স্থান হবে। হযরত ওমর রাঃ বলেন, ঐ সত্তার কসম যিনি তাকে সত্য সহকারে পাঠিয়েছেন, যে কাফির সম্পর্কে যে সীমারেখা তিনি নির্দিষ্ট করেছেন তাদের মৃত্যু সে সীমারেখা থেকে তিল পরিমানও আগেপিছে হয়নি।”
[মুসলিমঃ ২৮৭৩ এবং ৪৪৭০]

যুদ্ধবন্দীদের মুক্তিপণের বিনিময়ে মুক্ত করার সিদ্ধান্ত হয়। হযরতের চাচা আব্বাস রাঃ এর ভাগে পড়ে ৮০ উকিয়া যা প্রায় ৮০ হাজার টাকার সমান। এত বেশি অর্থ প্রদানে অক্ষমতা প্রকাশ করলে নবীজি ﷺ বলেন, “আপনি উম্মুল ফজলের নিকট যে অর্থ ও স্বর্ণ রেখে এসেছেন তা থেকে দিন।”
বিম্ময়ের সাথে হযরত আব্বাস বলে উঠলেন, আল্লাহর শপথ, উম্মুল ফজলের নিকট গচ্ছিত অর্থের বিষয় আল্লাহ ছাড়া আর কেউ জানে না। আমি ঘোষণা দিচ্ছি, “নিশ্চয়ই আপনি আল্লাহর রাসূল।”
[আল-বেদায়া ওয়ান-নেহায়া, আল্লামা আব্দুল আব্দুল জলীল রহঃ এর “নূরনবী” পৃষ্ঠাঃ ১৫৮]
হযরত আনাস ইবনে মালেক রাঃ থেকে এই হাদিসের শেষাংশে বর্ণিত। অতঃপর কাফেরদের মৃতদেহগুলো ভাজ করে বদরের কূপে নিক্ষেপ করা হয়। তখন রাসূলুল্লাহ ﷺ তাদের নিকটে গেলেন এবং বললেন, হে অমুকের ছেলে অমুক, তুমি ওই অঙ্গিকার পেয়েছ যা আল্লাহ এবং তাঁর রাসুল তোমাদেরকে দিয়েছিলেন? নিশ্চয় আমি ওই অঙ্গিকার সত্য পেয়েছি। যা মহান আল্লাহ আমার সাথে করেছেন। হযরত ওমর রাঃ আরয করলেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আপনি ওই সব দেহের সাথে কিভাবে কথাবার্তা বলছেন যাদের মধ্যে রুহ নেই? তখন তিনি বললেন, যা আমি বলছি তা তোমরা মৃত কাফিরদের চেয়ে বেশী শ্রবনকারী নও অর্থ্যাত্‍ তারা মৃত ব্যক্তিরা তোমরা জিবীতদের চেয়ে বেশী শুনতে পায়। কিন্তু তারা উত্তর দিতে পারেনা ।
[মুসলিম, আস সহীহ, জান্নাত পর্ব, জান্নাতে মৃতের স্থান পেশ করা অধ্যায়, ২:৩৮৭, হাদিস: ২৮৭৩, ইসলামিক ফাউন্ডেশন ৬৯৫৮, ইসলামিক সেন্টার ৭০১৬]
যুদ্ধবন্দীদের সাথে কেমন আচরণ হবে তা এই যুদ্ধের মাধ্যমে বিশ্ববাসী প্রত্যক্ষ্য করল। যারা যুদ্ধপণ দিতে অক্ষম তাদেরকে মুসলমানদের গৃহশিক্ষক হিসেবে নিয়োগ করা হল। পরবর্তীতে এদের সবাই ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন। একমাত্র ইসলামের পক্ষেই যুদ্ধবন্দীদের সাথে এমন আচরণ সম্ভব। অথচ বিশ্ব দেখেছে কীভাবে সালাফী নামধারী জংগী গোষ্ঠী বিজিত অঞ্চলের মানুষকে জবাই করেছে। রোজা না রাখার অপরাধে ফাঁসি দিয়েছে আইএস যা সবাই দেখেছেন। এরাই প্রকৃতপক্ষে ইসলামের দুষমন। যারা ইসলামকে কলংকিত করছে। কারণ বিধর্মীরা ইসলাম জানবে কুরআন-হাদিস আর ইসলামের ইতিহাস পড়ে নয়, বরং এরা ইসলাম সম্পর্কে জানবে মুসলমানদের কার্যকলাপ দেখে। ফলে আইএস সহ সকল জংগী গোষ্ঠী ইসলামকে কলঙ্কিত করছে। আল্লাহ আমাদের সবাইকে বদরের যুদ্ধের তাৎপর্য থেকে শিক্ষা গ্রহণ করার তৌফিক দান করুণ! আমীন!

ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী