পবিত্র মে’রাজ শরীফ ভালোবাসার চূড়ান্তরূপ

ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী
ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী ফাইল ছবি

এএনবি ইসলাম ধর্ম ডেস্ক

ভালোবাসা অন্ধ। কথায় আছে ভালোবাসা এবং যুদ্ধে সবকিছু জায়েজ। মানে বৈধ। উহুদের যুদ্ধে রাসূলে-আরাবী [ﷺ]-এঁর রক্ত মুবারক পান করে নিয়েছিলেন এক সাহাবী। অথচ রক্ত পান হারাম। আর এ রক্ত পানের মাধ্যমে তিনি নিজের জন্য জাহান্নাম হারাম করে নিয়েছেন। কেননা এ রক্ত আল্লাহ্‌র মাহবুব [ﷺ]-এঁর। ভালোবাসার দাবী চিরন্তন। ভালোবাসা নির্দিষ্ট কোনও যুক্তি মানে না। ভালোবাসার অপর নাম তাই অন্ধ বিশ্বাস।

নবীজী [ﷺ] রাতের কিছু অংশে মক্কা মুকাররমা থেকে জেরুজালেমের মসজিদে আকসায় ভ্রমণ করেছেন। সেখান থেকে সপ্ত আকাশ পাড়ি দিয়ে সিদরাতুল মুনতাহায় গিয়েছেন। সেখান থেকে লা-জামান ও লা-মাকানে। আল্লাহ্‌ পাকের নানান নিদর্শন স্বচক্ষে অবলোকন করেছেন। জান্নাত-জাহান্নাম দেখেছেন। প্রভুর সান্নিধ্যে কাটিয়েছেন। কতক্ষণ? তা কেউ জানে না। বিভিন্ন সূত্রে এসেছে দীর্ঘ ২৭ বছর। আবার ফিরেও এসেছেন। ফিরে দেখেন বিছান তখনো গরম। অজুর পানি তখনো গড়িয়ে পড়ছিল। আবু জাহেল একথা বিশ্বাস করতে পারছিল না। কারণ রাসূল [ﷺ]-এঁর প্রতি তার কোনও ভালোবাসা ছিল না। ছিল অবিশ্বাস ও ঘৃণা। রাসূল [ﷺ] যা কিছুই বলেন, সে অবিশ্বাস করে বসে। যাদু বলে উড়িয়ে দেয়। মে’রাজের কথা শুনে তার চক্ষু চড়কগাছ। সে তা মানতে পারছে না। ডেকে ডেকে লোক জড়ো করছে। তোমরা কি শুনছো, মুহাম্মদ [ﷺ] কি বলছে? সবাই অবাক। চোখ ছানাবড়া। কাফেরেরা তা বিশ্বাস করতে পারছে না। ঘটনা রটছে চারিদিকে। এক মুখ থেকে বহু মুখে। সবাই চুপ, লা জবাব। এমন কি সাহাবাগণের কেউ কেউ তা প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেন নি। কাফেরদের ধোঁকায় তারাও দ্বিধায় পড়ে গিয়েছিলেন।

আবু বকর [রাদ্বিঃ] কে সামনে পেয়েই আবু জাহেল বলে উঠলো, “আবু বকর শুনছো? তোমার বন্ধু এক রাতেই মক্কা থেকে জেরুজালেম গিয়েছে। আবার ফিরেও এসেছে!” আবু বকর জানতে চাইলেন, “কে বলেছে এ কথা?” “কে আবার? তোমার বন্ধু, যে মক্কায় নতুন ধর্ম নিয়ে এসেছে, সে!” একথা শুনে এক মুহূর্ত চিন্তা করারও সময় নিলেন না আবু বকর [রাদ্বি]। বললেন, “মুহাম্মদ [ﷺ] বলে থাকলে তিনি সত্যিই বলেছেন।” আবু জাহেল এবার আরো ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলো। বলল, “তুমি কি পাগল হয়েছ? একরাতে মক্কা থেকে জেরুজালেম এবং সেখান থেকে আবার ফিরে আসা? এটা কি সম্ভব?” আবু বকর [রাদ্বিঃ] উত্তরে বলেন, “এর চেয়েও অবাক করার কথা আমি বিশ্বাস করেছি। আমি আল্লাহকে দেখিনি। মুহাম্মদ [ﷺ] বলেছেন তিনি আসমানের সে আল্লাহ্‌র কাছ থেকে ওহীহ পান। এটা তো তার চেয়েও সহজ ব্যাপার।”

এর নাম ভালোবাসা। আবু বকর [রাদ্বিঃ] কোনও কিছু না ভেবেই শোনামাত্রই তা বিশ্বাস করেছেন। কারণ তিনি মুহাম্মদ [ﷺ] কে ভালোবাসেন। ভালোবাসা অন্ধ। ভালোবাসার মানুষ বলেছে, কাজেই তা মিথ্যা হতে পারে না। তিনি উপাধি পেলেন “সিদ্দীকে আকবর”। আর আবু জাহেল যুক্তি খুঁজেছে। রাসূল [ﷺ]-এঁর কথা বিশ্বাস হয়নি। ফলে আবুল হাকাম থেকে আবু জাহেল হয়েছে সে। মানে মূর্খের পিতা।

হিজরতের রাতে রাসূল-প্রিয়তম [ﷺ] মওলা আলী [রাদ্বিঃ]-কে ডেকে বললেন, “আলী তুমি আমার বিছানায় আমার চাঁদর গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়ো। তাহলে কাফেরেরা মনে করবে আমি ঘরেই আছি। এ সুযোগে আমি নিরাপদে মক্কা পার হতে পারবো।” মওলা আলী এক মুহূর্তও সময় নিলেন না। নিজের জীবনের কথা একবারও ভাবলেন না। মুহাম্মদ [ﷺ] বিছানায় শুয়ে আছেন মনে করে কাফেরেরা তাঁকে হত্যা করতে পারে। হত্যা না করলেও মুহাম্মদঃ [ﷺ]-কে না পেয়ে রাগের বশবর্তী হয়ে তাঁর উপর অত্যাচার চালাতে পারে। তিনি উত্তরে বললেন, “আমি রাজি ইয়া রাসূলাল্লাহ”। এর নামই ভালোবাসা। রাসূল [ﷺ]-এঁর প্রতি ভালোবাসা। অন্ধ ভালোবাসা। যে ভালোবাসা জীবন দিতেও একটু ভাবায় না।

মে’রাজ তাই স্রষ্টার ভালোবাসা তাঁর শ্রেষ্ঠ সৃষ্টির প্রতি। শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে। যিনি তাঁর মাহবুব। নিজের মাহাত্ম এবং শ্রেষ্ঠত্ব তাই তুলে ধরলেন নিজের ভালোবাসার মানুষের কাছে। ভালোবাসার মানুষও ছুটে চললেন আপন হাবীবের পানে। স্বয়ং স্রষ্টা তাঁর রক্ষক। জিবরাঈল আ তাঁর সাথী এবং খাদেম। বাহন তাঁর বোরাক। মুখমণ্ডল মানুষের কিন্তু শরীর ঘোড়ার মতো। গতি বিদ্যুতের চেয়েও অধিক। যতদূর দৃষ্টি যায়, ততদূর ছুটে চলে এক পদক্ষেপে। লক্ষ্য সিদরাতুল মুনতাহা। উদ্দেশ্য নিকটবর্তী হওয়া, দুই ধনুক বা তারচেয়েও নিকটে। প্রত্যাশা এবং আকাংখ্যা যার পূর্ণতা লাভ করেছে।

মহান রব তাঁর মাহবুবকে দেখে আদরে, ভালোবাসায়, সম্মানে আর প্রেমের নিদর্শনে এক হাজার বার ডাক দিলেন, হে মুহাম্মাদ, হে মুহাম্মাদ, হে মুহাম্মাদ! অথচ পুরো কুরআনের কোথাও আপন মাহবুবকে নাম ধরে ডাক দেন নি তিনি, যেমন ডাক দিয়েছেন অন্যান্য নবী ও রাসূলগণকে। কিন্তু নিরালায় পেয়ে আপন মাহবুবের নাম ধরে ডেকেছেন। মাহবুবে রাব্ব [ﷺ] তাঁর স্রষ্টা হাবীবকে দেখে সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার উপস্থাপন করলেন। “আত্তাহিয়্যাতু…”।

। “অভিবাধন একমাত্র আল্লাহ্‌র। সমস্ত এবাদত একমাত্র আল্লাহ্‌র। সমস্ত পবিত্রতা একমাত্র আল্লাহ্‌র।” উত্তরে আল্লাহ্‌ পাক বললেন, “হে নবী! আপনার উপর শান্তি, বরকত এবং রহমত বর্ষিত হোক”। দয়াদ্র-মহিম [ﷺ] ঘোষণা করলেন, “আমাদের উপর এবং সৎকর্মশীল বান্দাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক”।

সাক্ষ্যদাতা ফেরেশতা এবং পবিত্র আত্মাসমূহ ঘোষণা করলেন, “আমরা সাক্ষ্য দিচ্ছি আল্লাহ্‌ ব্যতীত অন্য কোনও ইলাহ নেই। আরো সাক্ষ্য দিচ্ছি মুহাম্মাদ [ﷺ] আল্লাহ্‌র বান্দা ও রাসূল।”
হাবীব আর মাহবুবের এই অভিবাধন চিরস্থায়ী করার জন্য নামাযে তাশাহুদ হিসেবে নির্ধারিত হয়ে গেল।

সাথে উপহার হিসেবে পাওয়া গেলো ৫০ ওয়াক্ত নামায। মুসা আ আমাদের উপকার করলেন। ৫০ ওয়াক্ত থেকে কমিয়ে ৫ ওয়াক্তে আনতে সাহায্য করলেন। আমরা পড়বো ৫ ওয়াক্ত, কিন্তু সাওয়াব পাবো ৫০ ওয়াক্তেরই। মে’রাজের সর্বশ্রেষ্ঠ উপহার তাশাহুদ। আর তাই মু’মিনের জন্য নামায হলো মে’রাজ। বিস্ময়কর সফরে বিস্ময়কর কিছুর অবলোকন। আর বিস্ময়কর সফরের বিস্ময়কর প্রাপ্তি নামায। ভালোবাসার পূর্ণতা নামায। যা স্রষ্টা আর সৃষ্টিকে নিকটে নিয়ে আসে।

[বিঃ দ্রঃ চিন্তাশীলদের জন্য একটি বিষয়ের উপস্থাপনা করছি। ক্বাবা কাউসাইন যদি জিবরাঈল আ এর সাথেই হবে, তাহলে ৫০ ওয়াক্ত নামায কমিয়ে ৫ ওয়াক্তে আনতে ৯ বার রাসূলে আরাবী [ﷺ] কার কাছে গেলেন? জিবরাঈল আ এর কাছে আবেদন করতে নাকি রাব্বুল ইজ্জতের কাছে? ক্লু হিসেবে একটি হাদিস দেখতে পারেন। সহীহ বুখারি – ৭৫১৭ (ই ফা ৭০০৯)। হাদিসটি সহীহ মুসলিম এবং আহমাদেও রয়েছে।]

ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী
ডক্টর আব্দুল বাতেন মিয়াজী
ফাইল ছবি

লেখক গবেষক ইসলামি চিন্তাবিদ
শিক্ষক, লুন্দবিশ্ববিদ্যালয়, সুইডেন