ভোটে আস্থা নেই তবু সব ভোটে বিএনপি

✍ ডেস্ক রিপোর্ট
চট্টগ্রাম সিটি ও সংসদের পাঁচ উপনির্বাচনে অংশ নেবে

নিকট অতীতে জাতীয় সংসদ, ঢাকা সিটি করপোরেশন নির্বাচনসহ কোনো ভোটই বিএনপির জন্য সুখকর ছিল না। প্রতিটিতে তারা পরাজিত হয়েছে। প্রতিটি ভোটের পরেই তারা অনাস্থা জ্ঞাপন করেছে, ফলাফল প্রত্যাখ্যান করেছে। ভোট কারচুপির অভিযোগ করেছে।

২০১৮ সালের ৩০ ডিসেম্বর একাদশ সংসদ নির্বাচনের পর দলটি বলে আসছে, ‘ভোটের পূর্ব রাতে ভোট ডাকাতি’ হয়েছে। ঐ নির্বাচনের পর তারা ঘোষণা দিয়েছিল, এই সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে যাবে না তারা। আওয়ামী লীগ সরকারের ওপর তাদের কোনো আস্থা নেই। তবু তারা আসন্ন জাতীয় ও স্থানীয় নির্বাচনগুলো বয়কট করছে না। সব নির্বাচনে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। সর্বশেষ আসন্ন পাঁচটি উপনির্বাচন এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনেও অংশগ্রহণের সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে বিএনপি।

গত সোমবার বিএনপির চেয়ারপারসনের গুলশান কার্যালয়ে দলের জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে দলটির নীতিনির্ধারকেরা সিদ্ধান্ত নিয়েছেন যে কোনো নির্বাচনই বিএনপি বিনা চ্যালেঞ্জে ছেড়ে দেবে না। সব নির্বাচনে দল অংশগ্রহণ করবে।

প্রতিটি নির্বাচনে পরাজয় ও বেশুমার অভিযোগের পরও কেন ভোটে থাকতে অবিচল, তা নিয়ে অনেকের প্রশ্ন, কেন এমন স্ববিরোধিতা? এর একটি ব্যাখ্যা অবশ্য দিয়ে আসছেন বিএনপির নেতারা। দলের নেতাদের একেকজন একেক ব্যাখ্যা দিচ্ছেন। তাঁরা বলছেন, ‘জেতার কোনো সুযোগ নেই, তবু আমরা নির্বাচনে থাকব আন্দোলনের অংশ হিসেবে।’ দলের মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল মঙ্গলবার চট্টগ্রামে গিয়ে আসন্ন চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন (চসিক) নির্বাচনে বিএনপির অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে বলেছেন, ‘আমরা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছি। আমরা মনে করি নির্বাচন ছাড়া ক্ষমতার পরিবর্তন হতে পারে না। আমরা মনে করি জনগণের ঐক্যের মধ্য দিয়ে এই সরকারের পতন ঘটানো যাবে। আমরা সমস্ত স্থানীয় নির্বাচনে যাব। এই সময়ের সবচেয়ে বড়ো গণতান্ত্রিক আন্দোলন হচ্ছে নির্বাচনে অংশ নেওয়া। আমাদের নিয়ম হলো, নির্বাচনের শিডিউল ঘোষণার পর দলীয় মনোনয়ন ফরম বিক্রি করব। সেখানে আগ্রহীরা দলীয় মনোনয়ন ফরম কিনে আবার জমা দেবেন। পরে আমাদের সংসদীয় মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে দলীয় প্রার্থী চূড়ান্ত করা হবে।’

মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, দেশে নির্বাচন বলতে কিছু নেই; নির্বাচনব্যবস্থাটাই নেই বলা চলে; দেশ থেকে গণতন্ত্র চিরতরে বিলীন হয়ে গেছে। এই সরকার মানুষের বাক্স্বাধীনতা হরণ করে নিয়েছে। ভোটাররা ভোট দিতে পারে না, রাতের আঁধারেই ভোট হয়ে যায়। ভোট থেকে মানুষ মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।

দলের একজন সিনিয়র নেতা বলেন, গণতন্ত্র ও বেগম জিয়ার মুক্তির আন্দোলনের অংশ হিসেবে তারা নির্বাচনে অংশ নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের নেতাকর্মীরা প্রতিকূল পরিস্থিতিতে রয়েছেন। নির্বাচনে গেলে আর যাই হোক, সক্রিয় কর্মকাণ্ড করা যায়। নেতাকর্মীরা রাজপথে নেমে স্বাচ্ছন্দ্য পান। স্থানীয় নির্বাচনে না গেলে দলের কোনো না কোনো নেতা দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে প্রার্থী হয়ে যান। দলের এক পক্ষ নিষ্ক্রিয় থাকে, অপর পক্ষ সক্রিয় হয়। এতে দল ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যেটা হয়েছে বিগত উপজেলা নির্বাচনের সময়। বিএনপি প্রথম তিন ধাপের নির্বাচনে অংশ নেয়নি। যারা বিদ্রোহ করে নির্বাচনে দাঁড়িয়েছিল, তাদের দুই শতাধিককে বহিষ্কার করা হয়। পরে বাধ্য হয়ে দল শেষ দুই ধাপের নির্বাচনে প্রার্থী দেয়। তাই নির্বাচনে না যাওয়ার চেয়ে যাওয়াই ভালো।

স্থায়ী কমিটির একজন নেতা বলেন, বর্তমানে বিএনপি সরকারি ফ্রেমওয়ার্কের বাইরে নয়। এ কারণে যা হয়েছে তা ভালো হয়েছে, যা হচ্ছে তা-ও ভালো হচ্ছে এবং যা হবে তা-ও ভালোই হবে। আরেকটা দিক হচ্ছে, বারবার ভোটে অংশ নিয়ে নাজেহাল হয়ে নিজের নাক-কান সব কেটে সরকারের যাত্রা ভঙ্গ করা। এসব বিচার-বিশ্লেষণ করেই নির্বাচনে থাকছে বিএনপি। যদিও এ নিয়ে দলের ভেতরে মতভিন্নতা রয়েছে।

সোমবারের স্থায়ী কমিটির বৈঠকে নির্বাচনে অংশগ্রহণ নিয়ে নেতারা দুই রকম মতামতই ব্যক্ত করেন। পরে ঐকমত্য হয় যে তারা আসন্ন নির্বাচনগুলোতে অংশ নেবেন। জানা গেছে, আগামী ২১ মার্চ গাইবান্ধা-৩, বাগেরহাট-৪ ও ঢাকা-১০ আসনে উপনির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। তিন আসনের উপনির্বাচনের মনোনয়ন দাখিল ১৯ ফেব্রুয়ারি, যাচাই-বাছাই ২৩ ফেব্রুয়ারি, আপিল দায়ের ২৪-২৬ ফেব্রুয়ারি, আপিল নিষ্পত্তি ২৮ ফেব্রুয়ারি, প্রত্যাহার ১৯ ফেব্রুয়ারি, প্রতীক বরাদ্দ ১ মার্চ, ভোট ২১ মার্চ।

ইসির সিনিয়র সচিব মো. আলমগীর জানিয়েছেন, ঢাকা-১০ আসনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহার করলেও অন্য দুই সংসদীয় আসনে পুরোনো পদ্ধতি, তথা ব্যালটে এই ভোট অনুষ্ঠিত হবে। শূন্য ঘোষিত বগুড়া-১ ও যশোর-৬ আসনে উপনির্বাচনের তারিখ পরে ঘোষণা করা হবে।

এছাড়া আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচনের তপশিল ঘোষণা করা হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন। ঢাকার মতো চট্টগ্রাম সিটিতেও ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিনে (ইভিএমে) ভোট হবে।