প্রবাস থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নামে ডিজিটাল হুন্ডি

প্রবাস থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নামে ডিজিটাল হুন্ডি
প্রতীকী ছবি

বিদেশে বাংলাদেশি অধ্যুষিত এলাকায় প্রায় দোকানেই বাংলায় একটি চিরকুট লেখা থাকে- ‘এখান থেকে মোবাইলের মাধ্যমে দেশে টাকা পাঠানো যায়’। বাংলাদেশের জন্য মোবাইল ব্যাংকিং বৈধ হলেও প্রবাস থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পাঠানো টাকাগুলো বৈধ কি না এ বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে। সৌদি থেকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠানোর প্রক্রিয়া অস্পষ্ট। জনপ্রিয় সার্চ ইঞ্জিন গুগলে বাংলাদেশে বিভিন্ন মোবাইল ব্যাংকিং প্রতিষ্ঠানগুলোর নাম লিখলেই চলে আসে শত শত ইউআরএল লিংক। আর এই ওয়েব অ্যাড্রেসের মাধ্যমে বিদেশ থেকে যাচ্ছে কোটি কোটি টাকা এবং এসব ওয়েবসাইট পরিচালিত হচ্ছে বাংলাদেশ থেকে। হুন্ডির মাধ্যমে তাদের কাছে টাকা পাঠালে তারা ওই অ্যাকাউন্টগুলোতে টাকা লোড দেয়। বিদেশ থেকে বৈধ পথে ব্যাংকের মাধ্যমে পাঠিয়ে সেখান থেকে দেওয়া গোপন কোড দেখালে তাৎক্ষণিক দেশে টাকা পাওয়া যায়। কিংবা বাংলাদেশের বিভিন্ন ব্যাংকে প্রবাসীদের সুবিধাভোগীদের হিসাব নম্বরে এ টাকা যোগ হয়। যখন এটাই বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর পথ, সেই পথের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হুন্ডির ধরন পাল্টেছে। কিন্তু আশ্চর্যজনক হলেও সত্য, প্রবাস থেকে এই অবৈধ মোবাইল ব্যাংকিং বন্ধ বা বৈধ করার কোনো উদ্যোগ নেই সরকারের। সাধারণত ব্যাংকিং চ্যানেলে বিদেশ থেকে পাঠানো টাকা হাতে পেতে এক-দুই দিন সময় লাগে। অথচ মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে টাকা পাঠালে তা পাওয়া যায় দু-চার মিনিটে। একই সঙ্গে দিতে হচ্ছে না কোনো ফি।

বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার হিসাবমতে, দেশে পাঠানো মোট রেমিট্যান্সের ১৫ থেকে ২০ শতাংশ আসে হুন্ডির মাধ্যমে। সেই হিসাবে বাড়তি মাত্রা যোগ করেছে মোবাইল ব্যাংকিং নামের ‘ডিজিটাল হুন্ডি’। সাধারণত মধ্যপ্রাচ্য, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশে ব্যাপক জনপ্রিয় এই মোবাইল ব্যাংকিং। খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, বিদেশে অবস্থানরত হুন্ডি ব্যবসায়ীরা প্রবাসীদের কাছ থেকে টাকা গ্রহণের পর তা অনলাইন সফটওয়্যার অথবা মেসেজের মাধ্যমে দেশে থাকা এজেন্টকে জানিয়ে দেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের অ্যাকাউন্ট নম্বর এবং টাকার পরিমাণ। তারপর ওই এজেন্ট দেশ থেকে টাকা বিকাশে পাঠিয়ে দেন। সৌদি আরবের বিভিন্ন শহর ঘুরে দেখা গেছে, বাংলাদেশি মোবাইল দোকান, খাবারের হোটেল, সবজির দোকানেও পাওয়া যাচ্ছে এসব মোবাইল ব্যাংকিং। তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, প্রতিদিন কয়েক কোটি টাকা লেনদেন হচ্ছে এই মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে। প্রবাসী মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসায়ীরা তাদের ডিজিটাল অ্যাকাউন্টে ব্যালেন্স নিতে আশ্রয় নিচ্ছেন হুন্ডির। আর এই টাকার সবটাই থেকে যাচ্ছে সরকারের হিসাবের বাইরে।

কয়েকজন মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবসায়ীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ওয়েব ডোমেইন কিনে মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবহারের উপযোগী করে ডিজাইন তৈরি করা হয়, যেখানে অনেকগুলো ইউজার নেইম ও পাসওয়ার্ড যুক্ত করার সুযোগ থাকে। পরে একজন অ্যাডমিন খুচরা বিক্রেতাদের কাছে একটি করে ইউজার নেইম ও পাসওয়ার্ড বিক্রি করে থাকেন। সেই উইজারে বিক্রেতা তার ইচ্ছামতো ব্যালেন্স নিতে পারেন আর সেই ব্যালেন্সের ক্যাশ টাকাও বাংলাদেশে পাঠানো হয় হুন্ডির মাধ্যমে। মধ্যপ্রাচ্য বা অন্য অনেক দেশে অনেক মানি এক্সচেঞ্জ বা টাকার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান তাদের দোকানে মোবাইল ব্যাংকিং লেখা সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে রাখে। সেখানে থাকা বাংলাদেশি অভিবাসীরা মনে করেন, এটাই ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ের শাখা। তাই তারা সেখানে দেশে সহজে টাকা পাঠানোর জন্য যান। সেখানে তারা দেশে থাকা কোনো স্বজনের ফোন নম্বর দেন, যে নম্বরে এই টাকা গ্রহণ করা হয়ে থাকে। বাংলাদেশি অভিবাসীদের একজন বলেন, ‘এরপর এসব প্রতিষ্ঠান দেশে থাকা তাদের কোনো এজেন্টকে ওই নম্বরে নির্দিষ্ট পরিমাণ টাকা লোড করার জন্য বলে দেন। সেই স্বজন হয়তো তখন তার মোবাইলের মাধ্যমেই টাকা পান। কিন্তু এ ক্ষেত্রে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নাম ব্যবহার করা হলেও আসলে হুন্ডির মাধ্যমে টাকার লেনদেন হচ্ছে।’ নির্মাণশ্রমিক জাহাঙ্গীর আলম বলেন, ‘২০১৩ সালে সৌদি এসেছি। কিন্তু ইকামা কী জিনিস তা চোখে দেখিনি। একরকম বাধ্য হয়েই মোবাইল ব্যাংকিংয়ে টাকা পাঠাই।’ ১০ হাজার টাকা পাঠালে তা ওঠাতে গেলে ২০০ টাকা চার্জ নিলেও ঘরে বসে তাৎক্ষণিক পাওয়া যায়। তিনি বলেন, আমরাও বৈধভাবে টাকা পাঠাতে চাই। উপায় না পেয়ে মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পাঠাতে হয়। দীর্ঘদিন একটি কারখানায় কর্মরত আফজাল হোসেন বলেন, মোবাইল ব্যাংকিং অবৈধ সেটা জানা ছিল না। যদি অবৈধ হয় তাহলে এর বিজ্ঞাপন প্রচার করা হয় কীভাবে!- প্রশ্ন রাখেন এই কারখানা শ্রমিক।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন ব্যাংকার বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে যেসব মোবাইল ব্যাংকিং সার্ভিস চালু আছে, সেগুলো বাংলাদেশে অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে শতভাগ বৈধ। তবে বিদেশ থেকে যেটা যাচ্ছে সেটা শতভাগ অবৈধ। এই জাতীয় অবৈধ ব্যাংকিং বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।

রিয়াদ প্রতিনিধি অফিসে কর্মরত সোনালী ব্যাংকের অ্যাসিস্ট্যান্ট জেনারেল ম্যানেজার (এজিএম) মো. জসিম উদ্দিন খান বলেন, অবৈধ পথে টাকা পাঠালে কেউ ব্যক্তিগতভাবে লাভবান হলেও তা রাষ্ট্রের জন্য ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর আহ্বান জানান এই ব্যাংকার। প্রবাসী আয় নেতিবাচক হলে জিডিপিতে নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। যে পরিমাণ অর্থ পাচার হয়ে যাচ্ছে, তা দেশে বিনিয়োগ হলে মোট জাতীয় উৎপাদন বৃদ্ধি পেত। কর্মসংস্থান সৃষ্টি হতো। হুন্ডি ব্যবসা বন্ধ হলে দেশের রিজার্ভ যেমন বৃদ্ধি পাবে, দেশের রাজস্ব আয় বৃদ্ধিসহ স্থানীয় বিনিয়োগের পরিমাণও অনেকাংশে বাড়বে। ফরেন রেমিট্যান্স দেশের রিজার্ভের প্রধান খাত হিসেবে চিহ্নিত। প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের ওপর সরকার ২ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া শুরু করেছে। প্রবাসীরা যেন হুন্ডি ব্যবসায়ীদের প্রলোভনে না পড়েন, সেই কর্মসূচি গ্রহণ করা প্রয়োজন। বৈধ পথে অর্থ পাঠানোর জন্য প্রবাসীদের সব ধরনের ভোগান্তি দূর করার উদ্যোগ নিতে হবে। এ ছাড়া হুন্ডির সম্প্রসারণ রোধে কার্যকর পদক্ষেপ প্রয়োজন। কারণ হুন্ডি ব্যবসা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য হুমকিস্বরূপ।